অভিমান করে ঘর ছেড়েছিলেন ২৫ বছর আগে, মৃত্যুর পর পরিচয় মিলল ‘বুবি’র
অভিমান করে প্রায় ২৫ বছর আগে বাড়ি ছেড়েছিলেন ববি বেগম ওরফে ওয়াহিদা বেগম (বুবি। দীর্ঘদিনের খোঁজাখুঁজির পর পরিবারের সদস্যরা অবশেষে তার সন্ধান পেলেও ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। নরসিংদীর রায়পুরার মেথিকান্দা রেলস্টেশনে হামলার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন এই বাকপ্রতিবন্ধী বৃদ্ধা।
রোববার বগুড়া থেকে আসা স্বজনরা মেথিকান্দা স্টেশনসংলগ্ন নুরপুর কবরস্থানে তার কবর জিয়ারত করেন। এ সময় পরিবারের সদস্যদের কান্নায় আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ববি বেগমের তিন ভাই-বোনসহ ১৩ সদস্যের একটি দল ভোরে বগুড়া থেকে রওনা দিয়ে বিকেলে মেথিকান্দায় পৌঁছায়। উপস্থিত ছিলেন তার তিন বাকপ্রতিবন্ধী ভাই-বোন আনিসুর রহমান প্রামাণিক, আনসার আলী প্রামাণিক ও ফাতেমা বেগম। অসুস্থতার কারণে পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য আসতে পারেননি।
বগুড়ার গাবতলী উপজেলার রামেশ্বরপুর ইউনিয়নের ঘোন সাগাটিয়া গ্রামের বাসিন্দা ববি বেগম প্রায় ২৫ বছর আগে পারিবারিক অভিমান থেকে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। পরিবারের সদস্যরা জানান, তিন বছর ধরে বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজির পরও তার কোনো সন্ধান না পাওয়ায় একসময় তারা আশা ছেড়ে দেন।
ববির ছোট বোনের জামাতা সৈকত ইসলাম বলেন, ২৫ বছর আগের পরিস্থিতিটা বুঝতে হবে। এক ভাই ছাড়া বাকি ছয় ভাই-বোনই ছিলেন বাকপ্রতিবন্ধী। সেই ভাই দীর্ঘ তিন বছর বিভিন্ন জায়গায় খুঁজেছেন। পরে তিনি মারা গেলে আর কেউ খোঁজ চালিয়ে যেতে পারেননি। আমাদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজন মিলিয়ে প্রায় ২০ জন বাকপ্রতিবন্ধী।
পরিবার জানায়, ববি বেগমের বাবা-মা দুজনই বাকপ্রতিবন্ধী ছিলেন। তাদের আট সন্তানের মধ্যে সাতজনই একই প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন। ববিসহ তিন ভাই-বোন মারা গেছেন। জীবিত পাঁচ ভাই-বোনের সবাই বাকপ্রতিবন্ধী। বিয়ের দেড় বছরের মাথায় স্বামী মারা যাওয়ার পর বাবার বাড়িতেই থাকতেন তিনি। একমাত্র সন্তানটিও জন্মের পরপরই মারা যায়।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি দেখে পরিবার নিশ্চিত হয়, মেথিকান্দা স্টেশনের নিহত বৃদ্ধাই তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বজন ওয়াহিদা বেগম।
রেলওয়ে পুলিশ ও স্টেশন কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রায় দুই যুগ আগে একটি ট্রেন থেকে নেমে মেথিকান্দা স্টেশনেই আশ্রয় নেন ববি বেগম। এরপর স্টেশনের পরিত্যক্ত একটি কক্ষেই বসবাস শুরু করেন। প্ল্যাটফর্ম ঝাড়ু দেওয়া, শৌচাগার পরিষ্কারসহ বিভিন্ন কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। স্থানীয় মানুষ ও নিয়মিত যাত্রীরা তাকে খাবার ও অর্থ দিয়ে সহায়তা করতেন। সেই অর্থের একটি বড় অংশ তিনি জমিয়ে রেখেছিলেন।
গত ৪ জুলাই গভীর রাতে কয়েকজন দুর্বৃত্ত তার কক্ষে ঢুকে জমানো টাকা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে নির্মমভাবে মারধর করে এবং টাকা লুট করে পালিয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকার পর ৮ জুলাই নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর স্টেশনমাস্টার ভৈরব রেলওয়ে থানায় মামলা করেন। পরে ববি বেগমের মৃত্যুর পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হয়। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে সাকিব মিয়া, ইলিয়াছ মিয়া, বিল্লাল মিয়া, দ্বীন ইসলাম ও রিফাত মিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রোববার আদালত তাদের প্রত্যেকের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
ববির ছোট বোনের জামাতা সৈকত ইসলাম বলেন, অনেকে ভাবছেন আমরা টাকার জন্য এসেছি। যদি তার কোনো জমানো টাকা থাকে, তা স্থানীয় মসজিদ, মাদ্রাসা বা এতিমখানায় দিয়ে দেওয়া হোক। ওই টাকা আমাদের দরকার নেই। ২৫ বছর পর তার কবরটা দেখতে পেরেছি, এটাই আমাদের শান্তি।
তিনি আরও বলেন, মেথিকান্দা স্টেশন ও আশপাশের মানুষের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। তারা এত বছর বুবিকে আপনজনের মতো আগলে রেখেছিলেন।
মতামত দিন