Views Bangladesh Logo

‘ফুললি ফান্ডেড’ বৃত্তির মিথ্যা আশ্বাস, পাকিস্তানে গিয়ে খরচের চাপে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ফুললি ফান্ডেড’ বা সম্পূর্ণ অর্থায়িত বৃত্তির ঘোষণা দিয়েছিল পাকিস্তান। কিন্তু আবেদন, পরীক্ষা ও দীর্ঘ বাছাই প্রক্রিয়া শেষে মাস্টার্সে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের হাতে যে অফার লেটার পৌঁছেছে, তাতে প্রতিশ্রুত সুবিধার বেশিরভাগই নেই। টিউশন ফি ও আবাসন খরচ মওকুফের প্রস্তাব দেওয়া হলেও খাবার, মাসিক ভাতা, যাতায়াত, বিমান ভাড়া, ভিসা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বহনের কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা।

গত বছরের আগস্টে পাকিস্তানের ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের ঢাকা সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়াতে ‘নলেজ করিডোর’ চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়। পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশন (এইচইসি) এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। ইসহাক দারের সফরটি ছিল প্রায় ১৩ বছর পর কোনো পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম ঢাকা সফর। এর আগে ২০১২ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রাব্বানি খা ঢাকায় এসেছিলেন।

নলেজ করিডোরের আওতায় পাঁচ বছরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য মোট ৫০০টি পূর্ণাঙ্গ বৃত্তি দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। ব্যাচেলর, মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ঘোষিত এ বৃত্তিতে টিউশন ফি, মাসিক জীবনযাপন ভাতা, মাসিক আবাসন খরচ, এককালীন সেটেলমেন্ট অ্যালাউন্স এবং একবার যাওয়া-আসার বিমান টিকিট দেওয়ার কথা ছিল। ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশন, পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশন এবং বিভিন্ন শিক্ষা মেলায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতেও নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের জন্য এসব সুবিধার কথা উল্লেখ করা হয়।

কর্মসূচির প্রথম ধাপে গত ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ৭৪ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ধাপে ধাপে পাকিস্তানে গিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। এরপর গত মে মাসে ঢাকায় পাকিস্তান এডুকেশন এক্সপোর দ্বিতীয় ধাপের কার্যক্রম শুরু হয় এবং নতুন করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আবেদন নেওয়া হয়। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপে মাস্টার্সের জন্য নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা ভর্তি প্রক্রিয়ার শেষ পর্যায়ে এসে জানতে পারেন, তাদের জন্য আগের ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ অর্থায়নের পরিবর্তে কেবল টিউশন ফি ও ডরমিটরি বা আবাসন খরচ মওকুফের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষার্থী বলেন, শুরু থেকেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিজ্ঞপ্তি ও অফিসিয়াল পোস্টে বৃত্তিটিকে ‘ফুললি ফান্ডেড’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। এজন্য আবেদন, পরীক্ষা ও বাছাইয়ের প্রতিটি ধাপ শেষ করে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু প্রক্রিয়ার শেষ পর্যায়ে এসে শুধু টিউশন ফি ও আবাসন খরচ বহনের প্রস্তাব পাওয়ায় তারা হতাশ হয়েছেন। তার অভিযোগ, শুরু থেকেই যদি মাস্টার্সে পূর্ণাঙ্গ অর্থায়নের সুযোগ না থাকত, তাহলে আবেদন শুরুর সময়ই বিষয়টি পরিষ্কার করা উচিত ছিল।

পিএএফ-আইএএসটি, হারিপুরে মাস্টার্সে পড়ার জন্য নির্বাচিত আশরাফুল ইসলাম রুম্মনও অফার লেটারে ঘোষিত সুবিধার সঙ্গে বাস্তবতার পার্থক্যের কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নলেজ করিডোরের প্রচারে টিউশন ফি, আবাসন, বিমান ভাড়া, মাসিক উপবৃত্তি ও সেটেলমেন্ট অ্যালাউন্সের কথা বলা হলেও তাকে দেওয়া অফার লেটারে কেবল ১০০ শতাংশ টিউশন ফি এবং আবাসন খরচ বহনের কথা রয়েছে। জীবনযাপন, পরিবহন, ভিসা, চিকিৎসা বীমা ও অন্যান্য খরচ এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।

আরেক শিক্ষার্থী আবু মুসা জানান, তার অফার লেটারেও মাসিক জীবনযাত্রার ভাতা, খাবার, স্বাস্থ্য বীমা কিংবা বিমান ভাড়ার কোনো সুবিধা রাখা হয়নি। তার দাবি, মাসিক উপবৃত্তি ছাড়া পাকিস্তানে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া তার মতো শিক্ষার্থীদের জন্য কঠিন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, যে বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রামের জন্য আবেদন করেছিলেন, তার পরিবর্তে তার সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

আরও কয়েকজন নির্বাচিত শিক্ষার্থীও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, ‘ফুললি ফান্ডেড’ বৃত্তির কথা বলে আবেদন করানোর পর শেষ পর্যায়ে গিয়ে আংশিক সুবিধার অফার দেওয়া হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের সময়, অর্থ ও শ্রম নষ্ট হয়েছে। কেউ কেউ এমনকি এই প্রক্রিয়াকে প্রতারণার সঙ্গে তুলনা করেছেন। এ ছাড়া মাস্টার্সের ফল প্রকাশেও নির্ধারিত সময়ের তুলনায় দেরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে গত ১ সেপ্টেম্বর জানতে চেয়ে ই-মেইল করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশনের কাউন্সিলর শাবিদ উল্লাহ ওয়াজির জানান, বিষয়টি উচ্চশিক্ষা কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত হওয়ায় তারা সেখান থেকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। তবে পরবর্তী সময়ে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো তথ্য পাননি বলে জানান।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালকের কাছেও বিষয়টি জানতে চাওয়া হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয়) নজরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমাদের ‘নলেজে’ নেই।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফায়েজের মতে, ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব সুবিধার এমন পার্থক্য থাকলে তা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান বিষয়টিকে যৌক্তিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।

অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ও সাবেক রাষ্ট্রদূত শহীদুল হক বলেন, বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। কোথাও কোনো সমন্বয়গত ঘাটতি থাকলে তা দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন, কারণ এর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ জড়িত।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ