দখল ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা সরকারের জন্য অশনিসংকেত: টিআইবি

দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের জন্য অশনিসংকেত বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলেছে, এসব কর্মকাণ্ডে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি সারাদেশে দলের আত্মশুদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের বরাত দিয়ে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পুলিশের উপস্থিতিতে মধ্যরাতে লুটপাট, ভাঙচুর ও জবরদখল, কিশোরগঞ্জে জলমহাল দখলকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ এবং একটি কনটেন্ট ক্রিয়েটরের কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ জানিয়েছে টিআইবি।
বুধবার দেওয়া এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাড্ডা এমসিএইচ-এ লুটপাট, ভাঙচুর ও জবরদখলের ঘটনা সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের জন্য বিব্রতকর। তাঁর প্রশ্ন, জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের একজন সদস্যের পৃষ্ঠপোষকতায় পুলিশের উপস্থিতিতে শত শত মানুষের সামনে দীর্ঘদিন ধরে দরিদ্র ও অসহায় মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসা একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা কী ধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন।
তিনি বলেন, রক্তক্ষয়ী জুলাই অভ্যুত্থানের পর কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান এবং ঐতিহাসিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা দলের নেতাকর্মীদের এমন কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের কাছে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। অতীতের স্বেচ্ছাচারী শাসনের স্মৃতি মানুষের মনে এখনো সতেজ—এমন বাস্তবতায় বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা দলের একাংশের বিরুদ্ধে ওঠা দখলবাজি ও চাঁদাবাজির অভিযোগের পরিণতি নিয়ে যথেষ্ট ভাবছেন কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে বিএনপির নেতাকর্মীদের একটি অংশের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ উঠছে। তৃণমূল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের একাংশের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড নিয়ে গণমাধ্যম, পর্যবেক্ষক ও রাজনৈতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ঢাকার সায়েদাবাদ, মহাখালী ও গাবতলীসহ চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনার প্রধান বাস টার্মিনাল, ফুটপাত, বাজার, জলমহাল, বালুমহাল, হাটবাজার, কেবল ও ইন্টারনেট সংযোগ এবং বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবসায়ও চাঁদাবাজি ও দখলবাজির হাতবদলের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এসব নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও বিরোধ অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দৈনিক, মাসিক ও এককালীন চাঁদাবাজির অভিযোগ চলমান থাকার মধ্যেই সরকারের একজন মন্ত্রী চাঁদাবাজিকে ‘দুর্নীতি নয়, সমঝোতার লেনদেন’ হিসেবে উল্লেখ করে একাধিকবার বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর এমন বক্তব্যের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এতে চাঁদাবাজি ও দখলবাজি আরও স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কিশোরগঞ্জে জলমহাল দখলকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ এবং ক্রিয়েটিভ স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তাঁর মতে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে ঘটে চলা বিভিন্ন ঘটনারই ধারাবাহিকতা এসব ঘটনা। এর মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগ ও সদিচ্ছা প্রশ্নের মুখে পড়ছে এবং জনগণের কাছে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে।
টিআইবি বলেছে, দুর্নীতিবিরোধী নির্বাচনী অঙ্গীকারের প্রতি সরকার ও ক্ষমতাসীন দল সত্যিকার অর্থে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলে এখনই কার্যকর আত্মশুদ্ধিমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। দখলবাজি ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর উচ্চপর্যায় থেকে বিব্রত হওয়ার কথা জানিয়ে বহিষ্কারসহ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও এসব কর্মকাণ্ড ঠেকাতে কার্যকর ও কঠোর প্রতিরোধমূলক কৌশলের ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহারে জড়িতদের সঙ্গে সরকারি দলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না বলে দাবি করেছে টিআইবি।
সংস্থাটির মতে, এর ফলে স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি, অনিয়ম ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি আবারও প্রতিষ্ঠা পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনার দায় সরকারকেই নিতে হবে উল্লেখ করে টিআইবি প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।
মতামত দিন