চরম তাপদাহে কমছে আয়, বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়; ঝুঁকিতে বাংলাদেশের লাখো পরিবার: প্রতিবেদন
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা চরম তাপদাহ বাংলাদেশের লাখো শ্রমজীবী মানুষের আয় কমিয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়াচ্ছে চিকিৎসা ব্যয়। ফলে দেশের অসংখ্য পরিবার দ্বিমুখী অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ছে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাডেলফি গ্লোবালের নতুন এক প্রতিবেদন।
রোববার প্রকাশিত ‘তাপ, স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়: জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ুজনিত চরম তাপের সম্মিলিত অর্থনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। ভারত ও নাইজেরিয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশেও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান বেশি, স্বাস্থ্য ব্যয় দ্রুত বাড়ছে এবং সামাজিক সুরক্ষা সীমিত থাকায় লাখো মানুষ বড় ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে তাপজনিত চাপের কারণে বাংলাদেশের কৃষি ও নির্মাণ খাতের শ্রমিকরা বছরে গড়ে ২৩ দশমিক ৭৫ কর্মদিবস হারাতে পারেন। বর্তমানে এসব খাতে কর্মঘণ্টা ক্ষতির হার ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ হলেও নিম্ন-নিঃসরণ জলবায়ু পরিস্থিতিতেও ২০৩০ সালের মধ্যে তা বেড়ে ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
সব খাত মিলিয়ে কর্মঘণ্টা ক্ষতির হার বর্তমানের ৪ দশমিক ২৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশে উন্নীত হওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছে। এতে বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, কারণ তাদের অধিকাংশেরই বেতনসহ ছুটি, স্বাস্থ্যবিমা বা আয়ের কোনো সুরক্ষা নেই।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যয়ের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭৯ দশমিক ৩ শতাংশ সরাসরি জনগণকে নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে হয়েছে, যা পর্যালোচনায় থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। ২০০০ সালের তুলনায় মাথাপিছু ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয় ৮৩০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে, যা জলবায়ুজনিত আয়হ্রাসের সঙ্গে মিলিয়ে পরিবারগুলোর ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আগামী কয়েক দশকেও বিশ্বের সবচেয়ে তাপঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে থাকবে বাংলাদেশ। ২০২০ থেকে ২০৩৯ সালের মধ্যে দেশের অধিকাংশ এলাকায় বছরে ১৮৩ থেকে ২৩৯ দিন তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকতে পারে এবং আর্দ্রতাজনিত তাপঝুঁকি উচ্চ থেকে অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে থাকবে।
চরম তাপপ্রবাহের সময় কিছু খাতে উৎপাদনশীলতা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে, যা জীবিকা ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চরম তাপের কারণে বাংলাদেশে শ্রম আয় ও উৎপাদনশীলতায় প্রায় ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়েছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৫ শতাংশের সমান।
এ ছাড়া তাপপ্রবাহের সময় ঘন ঘন বিদ্যুৎ সংকট কারখানার শ্রমিক, কর্মচারী ও সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ বা পর্যাপ্ত শীতলীকরণ সুবিধা ব্যাহত হওয়ায় কর্মপরিবেশ আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
প্রতিবেদনে জলবায়ু অভিযোজন, জনস্বাস্থ্য ও শ্রমিক সুরক্ষাকে আলাদা নীতির আওতায় না রেখে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয়ের ওপর নির্ভরতা কমানো, তাপপ্রবাহে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ও শ্রম অধিকার সম্প্রসারণ, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত করা এবং স্বাস্থ্য ও শ্রমিক সুরক্ষায় জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি উপসংহারে বলেছে, বাংলাদেশে তাপপ্রবাহের মাত্রা ও স্থায়িত্ব বাড়তে থাকায় জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং মানুষের আয় রক্ষা এখন দেশের জলবায়ু অভিযোজন ও উন্নয়ন কৌশলের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
মতামত দিন