এআই-যুগের তরঙ্গ চাহিদা দেড় হাজার মেগাহার্টজ, স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছ মডেলের দাবি
স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছ, বিশ্লেষণভিত্তিক ও প্রকাশযোগ্য একটি মূল্যায়ন মডেল প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন টেলিযোগাযোগ খাতের বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনরা। তাঁদের মতে, স্পেকট্রামকে কেবল সরকারের তাৎক্ষণিক রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে না দেখে জাতীয় ডিজিটাল অবকাঠামো এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড ও আইওটিনির্ভর আগামী অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।
শনিবার (১৫ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ের হলিডে ইন হোটেলে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত ‘স্পেকট্রাম ফর এ কানেক্টেড বাংলাদেশ: এনাবলিং ইন্টারনেট ফর অল’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ জানান, বর্তমানে ফিচার ফোন ব্যবহার করা ৭ কোটি মানুষকে নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল ডেটা নেটওয়ার্কের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। এ জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে স্মার্টফোন প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সরকার উদ্যেগ নিয়েছে।
অন্যদিকে বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি মিলিয়ন গ্রাহকের জন্য ২ দশমিক ৩ মেগাহার্টজ বেতার তরঙ্গ বরাদ্দ আছে, যা বৈশ্বিক আদর্শ মাত্রার চেয়ে অনেক কম।
মূল্যায়নে তিন পদ্ধতির সমন্বিত মডেলের প্রস্তাব
মূল প্রবন্ধে টেলিকম বিশেষজ্ঞ মুনির হাসান বলেন, একটিমাত্র পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে স্পেকট্রামের অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। তিনি ওডিবি, ডিসকাউন্টেড ক্যাশ ফ্লো (ডিসিএফ) ও বেঞ্চমার্কিং—এই তিন পদ্ধতির সমন্বয়ে একটি মূল্যায়ন কাঠামোর প্রস্তাব দেন। তাঁর ব্যাখ্যায়, ওডিবিতে নেটওয়ার্ক অর্থনীতির ভিত্তিতে নির্দিষ্ট স্পেকট্রামের প্রান্তিক মূল্য নির্ধারিত হয়; ডিসিএফে দেখা হয় ওই স্পেকট্রাম ব্যবসায় কী অতিরিক্ত মূল্য তৈরি করবে বা না থাকলে কী পরিমাণ মূল্য কমবে; আর বেঞ্চমার্কিংয়ে অন্য দেশের বাজারে একই বা কাছাকাছি ব্যান্ডের দাম তুলনা করে বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করা হয়।
তিনি বলেন, তিন পদ্ধতির ফল একত্র করে একটি অর্থনৈতিক মূল্যসীমা নির্ধারণ করতে হবে এবং সেটি অপারেটরদের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে মিলিয়ে পরীক্ষা করতে হবে—নির্ধারিত মূল্য বহন করা বাস্তবে সম্ভব কি না, তাতে নেটওয়ার্ক বিনিয়োগ ও ব্যবসার স্থায়িত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি না। সঙ্গে সরকারের নীতিগত লক্ষ্য, বাজার কাঠামোয় প্রভাব ও প্রতিযোগিতার পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। তাঁর ভাষায়, মূল্যসীমাটি হতে হবে যৌক্তিক, স্বচ্ছ, পরীক্ষাযোগ্য ও প্রতিরক্ষাযোগ্য।
নিলামের অসামঞ্জস্য ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন
বিভিন্ন বছরের নিলাম বিশ্লেষণ করে মুনির হাসান জানান, ২০১৮ সালে অফার করা স্পেকট্রামের মাত্র ৩৩ শতাংশ বিক্রি হয়েছিল; ২০২১ সালে প্রতিযোগিতা থাকায় ২১০০ মেগাহার্টজের একটি ৫ মেগাহার্টজ ব্লকের দাম রিজার্ভ প্রাইসের চেয়ে ৭০ শতাংশের বেশি বেড়ে যায় এবং ২০০ মেগাহার্টজের বেশি অফারের মধ্যে প্রায় ১৯০ মেগাহার্টজ বিক্রি হয়। বিপরীতে ২০২৬ সালে ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের নিলামে একজন ছাড়া বাকি অপারেটররা সরে দাঁড়ানোয় রিজার্ভ প্রাইসেই স্পেকট্রাম বিক্রি হয়। প্রতিযোগিতা না থাকলে প্রকৃত বাজারমূল্য জানা যায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি প্রশ্ন তোলেন—২০১৩ সালে ২১০০ মেগাহার্টজের দাম ছিল প্রতি মেগাহার্টজ ২০ লাখ ডলার, আর আট বছর পর ‘গোল্ডেন স্পেকট্রাম’ খ্যাত ৭০০ মেগাহার্টজের দাম ডলারের হিসাবে সেই দামের কাছাকাছি চলে আসে; টাকার অঙ্কে প্রায় ২৩৭ কোটি টাকা, যা ২০১৮ সালের ৯০০ মেগাহার্টজের ২৫০ কোটি টাকার প্রায় সমান। অথচ ব্যান্ডগুলোর বৈশিষ্ট্য, কভারেজ ও নেটওয়ার্কে ভূমিকা এক নয়। কোন বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে এসব দাম নির্ধারিত হয়েছে, তার প্রকাশ্য ও বিশ্লেষণভিত্তিক কোনো নথি নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এআই ও ডিজিটাল অর্থনীতির চাহিদা
বক্তারা বলেন, স্পেকট্রামের ব্যয় কমানো ও পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত হলে নেটওয়ার্কে বিনিয়োগ বাড়বে, যার সুফল টেলিযোগাযোগের বাইরে ই-কমার্স, ফিনটেক, ক্লাউড সেবা, ডিজিটাল কনটেন্ট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ইন্টারনেট অব থিংস খাতেও ছড়িয়ে পড়বে। এআই ও ডেটানির্ভর সেবার চাহিদা যেভাবে বাড়ছে, তাতে ভবিষ্যতের ব্যান্ডউইথ চাহিদা মেটাতে স্পেকট্রামের মূল্য বর্তমান স্তরের অর্ধেকের নিচে নামানোর বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত বলে মত দেন তাঁরা।
জিএসএমএর গবেষণার বরাত দিয়ে জানানো হয়, বাংলাদেশে অপারেটরদের মোট রাজস্বের প্রায় ১৬ শতাংশ ব্যয় হয় স্পেকট্রাম ফিতে; এশিয়া-প্যাসিফিকে এ হার গড়ে ১০ এবং বৈশ্বিক গড় ৮ শতাংশ। ইউনিট মূল্য আঞ্চলিক গড়ের কাছাকাছি আনা গেলে ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের ৯৯ শতাংশ এলাকায় ফাইভজি পৌঁছানো সম্ভব, যা অর্থনীতিতে অতিরিক্ত ৩৪ বিলিয়ন ডলার যোগ করতে পারে; বৈশ্বিক গড়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে তা ৪৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। ২০২৫ সালে মোবাইল নেটওয়ার্ক পারফরম্যান্সে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল বিশ্বে ৯৩তম।
চলতি বছরের শেষে ৯০০, ১৮০০ ও ২১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের নবায়ন প্রসঙ্গে অপারেটর প্রতিনিধিরা বলেন, পাকিস্তান, ভারত ও ভিয়েতনামসহ কয়েকটি দেশ সম্প্রতি এসব ব্যান্ডের ফি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে; ইউরোপের কয়েকটি দেশ বাড়তি অর্থ ছাড়াই মেয়াদ বাড়িয়েছে। গ্রাহকপ্রতি গড় আয় দেড় ডলারের কম হওয়ার পরও স্পেকট্রাম ফি, বার্ষিক চার্জ ও ভ্যাটের চাপ অপারেটরদের ব্যয় বাড়াচ্ছে।
৭ কোটি মানুষকে নিরবচ্ছিন্ন ডেটা নেটওয়ার্কে আনার রূপরেখা
উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, উন্নত নেটওয়ার্কের পাশাপাশি সাশ্রয়ী মূল্যে স্মার্ট ডিভাইসের প্রাপ্তি নিশ্চিত করা ছাগা বড় অংশের সাধারন মানুষকে আজকের এআই প্রযুক্তির সুবিধাসহ ডিজিটাল ইকো সিম্টেমে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হবে না। দেশে প্রায় ১৪ কোটি মোবাইল ফোনের অর্ধেকই এখনো টু-জি বা বাটন ফোন। এই ফিচার ফোন ব্যবহারকারী প্রায় ৭ কোটি মানুষকেও নিরবচ্ছিন্ন ডাটা নেটওয়ার্কে আনতে হবে। এই ব্যবহারকারীদের রাতারাতি স্মার্টফোনে আনা সম্ভব নয়, তবে সম্মিলিত উদ্যোগে ধাপে ধাপে তা সম্ভব। তিনি জানান, শুরুতে ৩ হাজার টাকায় স্মার্টফোন তৈরির সম্ভাবনা যাচাই করা হলেও নির্মাতারা সাত দিনের মধ্যে বিল অব ম্যাটেরিয়াল তৈরি করে দেখান, সাড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার (৫০-৫৫ ডলার) মধ্যে তা সম্ভব। ভারতের রিলায়েন্সের ৩৯ ডলারের ফোনের মডেল—দুই-তৃতীয়াংশ টাচস্ক্রিন ও এক-তৃতীয়াংশ কিপ্যাড—অনুসরণ করে দেশীয় নির্মাতারা এ উদ্যোগ নিয়েছেন। এসব ফোনের কাঁচামালে ট্যাক্স, ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট শূন্য রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও জানান তিনি। স্মার্টফোন সাধারণ মানুষের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে পৌঁছাতে কিস্তি সুবিধার পাশাপাশি অপারেটরদের কো-ব্র্যান্ডিং ও ভয়েস-ডেটা বান্ডেলে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তরঙ্গ বরাদ্দে ঘাটতি, চ্যালেঞ্জের কথা জানাল বিটিআরসি
বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী বলেন, “বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি মিলিয়ন গ্রাহকের জন্য ২ দশমিক ৩ মেগাহার্টজ বেতার তরঙ্গ বরাদ্দ আছে। এটা বৈশ্বিক আদর্শ মাত্রার চেয়ে অনেক কম। আগামীতে ফাইভজি ও এআই মডেলের চাহিদা অনুযায়ী মোবাইল অপারেটরদের জন্য আরও প্রায় দেড় হাজার মেগাহার্টজ বেতার তরঙ্গের প্রয়োজন হবে। এই বেতার তরঙ্গ নিশ্চিত করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। আরও চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সেবার মানে গ্রাহক সন্তুষ্টি, অপারেটরদের ব্যবসায়িক সন্তুষ্টি এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ের সন্তুষ্টি নিশ্চিত করা। সেই চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখেই বিটিআরসি কাজ করছে।”
টিআরএনবি সভাপতি এস এম মাসুদুজ্জামান রবিনের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসাইনের সঞ্চালনায় বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন এমটব সভাপতি ও রবির সিইও জিয়াদ সাতারা, গ্রামীণফোনের সিইও ইয়াসির আজমান, বাংলালিংকের সিইও ইওহান বুসে, ফরেন চেম্বার্স অব কমার্সের প্রধান নির্বাহী টি আই এম নূরুল কবির, এমটব মহাসচিব লে. কর্নেল মোহাম্মদ জুলফিকার ও বিটিআরসির স্পেকট্রাম পরামর্শক ড. খালেদ মাহমুদ।
মতামত দিন