একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি আল মুজাহিদী আর নেই
একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আল মুজাহিদী আর নেই। শুক্রবার (১৯ জুন) দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।
দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতার পাশাপাশি হৃদরোগে ভুগছিলেন আল মুজাহিদী। গত কয়েক মাস ধরে তার শারীরিক অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছিল। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে গুরুতর অসুস্থ হয়ে তিনি ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) ভর্তি হন। সে সময় পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তার কিডনির কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল, শরীরে এসিড ছড়িয়ে পড়েছিল এবং হৃদ্যন্ত্রের জটিলতাও দেখা দিয়েছিল। এমনকি তিনি একটি মাইনর হার্ট অ্যাটাকেরও শিকার হন।
১৯৪৩ সালের ১ জানুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার নারুচি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আল মুজাহিদী। তার পিতা আবদুল হালিম জামালী এবং মাতা সাখিনা খান। শিক্ষাজীবনে তিনি ভিক্টোরিয়া হাই স্কুল, করটিয়া সাদত কলেজ, জগন্নাথ কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। সমাজবিজ্ঞান ও বাংলা ভাষা-সাহিত্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও আল মুজাহিদীর মূল পরিচয় ছিল কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় দেশের অন্যতম প্রাচীন সংবাদপত্র দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরবর্তীতে দৈনিক যায়যায়দিনেও সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশপ্রেম, মানবতা ও সামাজিক বাস্তবতা তার সাহিত্যকর্মে বারবার উঠে এসেছে।
বাংলা সাহিত্যের নানা শাখায় তার বিচরণ ছিল সমান স্বচ্ছন্দ। কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, গবেষণা, শিশু সাহিত্য ও অনুবাদ—সব ক্ষেত্রেই তিনি রেখে গেছেন উল্লেখযোগ্য অবদান। তার কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘হেমলকের পেয়ালা’, ‘ধ্রুপদ ও টেরাকোটা’, ‘যুদ্ধ নাস্তি’, ‘মৃত্তিকা অতি-মৃত্তিকা’, ‘প্রিজন ভ্যান’, ‘সৌর জোনাকি’, ‘অ্যাকাডেমাসের বাগান’, ‘সন্ধ্যার বৃষ্টি’, ‘আলবাট্রাস’ এবং ‘কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি জীবনানন্দ দাশ একাডেমি পুরস্কার, কবি জসীমউদ্দীন একাডেমি পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন একাডেমি পুরস্কার, শেরে বাংলা সংসদ পুরস্কার, জয়বাংলা সাহিত্য পুরস্কার এবং বাসাসপ কাব্যরত্ন পদক অর্জন করেন। ২০০৩ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হন।
কবি আল মুজাহিদীর মৃত্যুতে দেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের আবহ নেমে এসেছে।
মতামত দিন