‘একাত্তরের জননী’ রমা চৌধুরীর সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত বীরাঙ্গনা, লেখক ও সংগ্রামী নারী রমা চৌধুরীর সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভোররাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা, ব্যক্তিগত জীবনের অসহনীয় শোক এবং দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্যেও লেখনীকে আঁকড়ে বেঁচে থাকা এই নারীর জীবন আজও মানুষের মনে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
১৯৪১ সালের ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রমা চৌধুরী। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ১৯৬২ সালে কক্সবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে প্রায় ১৬ বছর বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধ তার জীবনে বয়ে আনে ভয়াবহ এক অধ্যায়। ১৯৭১ সালের ১৩ মে ভোরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তার পৈতৃক বাড়িতে হামলা চালায়। তাকে নির্যাতন করা হয় এবং একপর্যায়ে তাদের হাত থেকে পালিয়ে পুকুরে নেমে আত্মরক্ষা করেন তিনি। পরে হানাদাররা গানপাউডার দিয়ে তার ঘরবাড়ি ও সহায়-সম্পদ পুড়িয়ে দেয়। তিন সন্তান ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে এরপর যুদ্ধের বাকি সময় তাকে ঘরহীন অবস্থায় জলে-জঙ্গলে লুকিয়ে কাটাতে হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সেই ভয়াবহ স্মৃতি তিনি নিজের মধ্যে আটকে রাখেননি। জীবনের গভীর ক্ষত থেকে উঠে আসা অভিজ্ঞতাগুলো লিখে গেছেন ‘একাত্তরের জননী’ গ্রন্থে। বইটিতে উঠে এসেছে একাত্তরের যুদ্ধ, নির্যাতন, আতঙ্ক, সন্তানদের নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম এবং একজন নারীর অসীম মানসিক যন্ত্রণার কথা। মুক্তিযুদ্ধের সময় নারীদের ওপর চালানো নির্যাতনের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবেও গ্রন্থটি বিশেষভাবে পরিচিত।
স্বাধীনতার পরও রমা চৌধুরীর জীবনে দুঃখের শেষ হয়নি। বিজয়ের মাত্র কয়েক দিন পর, ২০ ডিসেম্বর মারা যায় তার সন্তান সাগর। ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মারা যায় আরেক সন্তান টগর। দীর্ঘদিন পর ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় তার আরেক ছেলে টুনু। একের পর এক সন্তান হারানোর বেদনা তাকে সারাজীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।
জীবনের এই অসহনীয় কষ্টের মধ্যেও তিনি লেখালেখি চালিয়ে যান। একসময় নিজের লেখা বই নিজেই মানুষের কাছে বিক্রি করেছেন। খালি পায়ে চট্টগ্রামের পথে পথে ঘুরে বই বিক্রি করা রমা চৌধুরী ধীরে ধীরে মানুষের কাছে হয়ে ওঠেন এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘একাত্তরের জননী’, ‘১০০১ দিন যাপনের পদ্য’, ‘আগুন রাঙা আগুন ঝরা অশ্রু ভেজা একটি দিন’, ‘ভাব বৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ’, ‘অপ্রিয় বচন’, ‘লাখ টাকা’ ও ‘হীরকাঙ্গুরীয়’।
মুক্তিযুদ্ধের পর দীর্ঘ সময় জুতো না পরেও জীবন কাটিয়েছেন তিনি। সন্তানদের মৃত্যুর শোক, যুদ্ধের ক্ষত এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করেও নিজের আদর্শ ও জীবনযাপনে অটল ছিলেন। তার খালি পায়ে পথচলা একসময় হয়ে উঠেছিল তার জীবনসংগ্রামের প্রতীক।
২০১৭ সালের ডিসেম্বরে বাসায় পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে যায় রমা চৌধুরীর। এরপর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। নানা শারীরিক জটিলতার সঙ্গে দীর্ঘদিন লড়াইয়ের পর ২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভোররাত ৪টা ৪০ মিনিটে মৃত্যুবরণ করেন।
মতামত দিন