জাটকা ধরায় ৮ মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর শুরু
জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো, জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে জাটকা আহরণে আট মাসের নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে। রোববার (১ নভেম্বর) থেকে কার্যকর হওয়া এ নিষেধাজ্ঞা আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত বহাল থাকবে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার আওতায় জাটকা ধরা, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ এবং পাইকারি ও খুচরা বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) গবেষক ও বিজ্ঞানীদের দীর্ঘমেয়াদি মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিনের মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান সফলভাবে পরিচালিত হয়েছে। এর ফলে নদীতে বিপুলসংখ্যক ইলিশের পোনা জন্ম নিয়েছে। বর্তমানে এসব পোনা উপকূলীয় নদ-নদী, মোহনা ও শাখা নদীতে বিচরণ করছে।
বিজ্ঞানীদের জীববৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, নভেম্বরের শুরুতে এসব পোনার দৈর্ঘ্য ৩ থেকে ৫ সেন্টিমিটার। প্রতি মাসে গড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৩ সেন্টিমিটার করে বাড়ছে এগুলো। স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ পেলে আগামী বছরের মে-জুন নাগাদ এসব পোনা ২৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য এবং প্রায় ৪০০ গ্রাম ওজনের পূর্ণাঙ্গ ইলিশে পরিণত হবে।
মৎস্য সংরক্ষণ ও সুরক্ষা আইন অনুযায়ী, এ আট মাসে ২৫ সেন্টিমিটার বা ১০ ইঞ্চির কম দৈর্ঘ্যের ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত, বাজারজাত কিংবা বেচাকেনা দণ্ডনীয় অপরাধ। নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল, বেহুন্দি জাল, মশারি জাল ও মনোফিলামেন্ট সিনথেটিক জালের ব্যবহার বন্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে এক থেকে দুই বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় আদালত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দুটিই দিতে পারবেন।
আইন বাস্তবায়নে মৎস্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে নদীবেষ্টিত জেলা ও উপজেলায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে যৌথ টাস্কফোর্স।
নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের বিশেষ দল গভীর সমুদ্র এবং উপকূলীয় নদীর মোহনায় বড় জাহাজ ও স্পিডবোট নিয়ে সার্বক্ষণিক টহল দিচ্ছে। দেশের ছয়টি নদী অভয়াশ্রমেও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এ ছাড়া জাটকার অবৈধ পরিবহন ও মজুত ঠেকাতে স্থলপথের চেকপোস্ট, পাইকারি মাছের বাজার এবং হিমাগারে র্যাব, পুলিশ ও বিজিবি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করবে।
নিষেধাজ্ঞার সময়ে নিবন্ধিত জেলেদের জীবিকা নির্বাহ ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় দেশের ইলিশপ্রবণ ২০ জেলার ৯৬টি উপজেলায় কার্ডধারী নিবন্ধিত জেলে পরিবারকে প্রতি মাসে বিনামূল্যে ৪০ কেজি করে ভিজিএফের চাল দেওয়া হবে।
মৎস্যবিজ্ঞানীদের মতে, শরৎকালে ২২ দিনের মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান নদীতে নতুন ইলিশের পোনা জন্ম নেওয়া নিশ্চিত করে। অন্যদিকে ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া আট মাসের জাটকা সংরক্ষণ কর্মসূচি এসব পোনার বেড়ে ওঠা ও পরিপক্বতা নিশ্চিত করে। এ দুই কর্মসূচির সমন্বিত বাস্তবায়নের ফলে ইলিশ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের শীর্ষস্থান ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।
মতামত দিন