Views Bangladesh Logo

ঈদ ও আধ্যাত্মিকতা

বাহ্যিক উৎসব থেকে অন্তরের জাগরণ। ঈদ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব হলেও এটি কেবল বাহ্যিক আনন্দ, ভোজ বা সামাজিক মিলনের আড়ম্ভরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মূলত ঈদের প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত রয়েছে এর আধ্যাত্মিক শিক্ষায়, যা মানুষের অন্তরকে শুদ্ধ করে, নৈতিকতা জাগ্রত করে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ককে আরও গভীর করে তোলে; যাতে আত্মদর্শনের অনাবিল আনন্দ প্রতিষ্ঠিত হয় সাধক বা ব্যক্তিচিত্তে। ইসলামে প্রচলিত দুটি ঈদ ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা—উভয়ই ভিন্ন প্রেক্ষাপটে হলেও একই লক্ষ্যের দিকে আহ্বান জানায়—আত্মসংযম, আত্মসমর্পণ ও আত্ম-উপলদ্ধি।

ঈদুল ফিতর মূলত রমজান মাসব্যাপী বাহ্যিক ও আত্মিক সাধনার পর প্রাপ্ত এক আধ্যাত্মিক পুরস্কার। রমজান মানুষকে ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ শেখায়। দিনের আলোতে বৈধ বিষয় থেকেও বিরত থাকার মাধ্যমে মানুষ উপলব্ধি করে, সে চাইলে নিজের ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছার অধীন করতে পারে। এই আত্মসংযমের মধ্য দিয়েই মানুষের অন্তরে জন্ম নেয় ধৈর্য, সহানুভূতি ও কৃতজ্ঞতার মতো গুণাবলি। ঈদুল ফিতর সেই আত্মিক উন্নতিরই উদ্যাপন, যেখানে ফাতারা শব্দ থেকে ইফতার। ফাতারা অর্থ দেহ ও মন ভেঙে ফেলা, যাতে পুনরায় দেহ ও মনের সমন্বয়ে আপন চিন্তার রূপান্তর না ঘটে। মন থেকে দেহের আকর্ষণকে একেবারে বিচূর্ণ করা তথা অতিক্রম করা, বাঁধ ভাঙা কিংবা বিরত থাকা। সুতরাং, পানাহার ও দুনিয়া থেকে বিরত থাকার নাম সিয়াম বা রোজা। সফলতা অর্জন করা তথা সৃষ্টির মোহবন্ধন থেকে মুক্তি লাভের শক্তি অর্জন করার নাম হলো প্রকৃত ইফতার। ইফতার প্রাপ্ত হলে মানুষ ভোগের অধীনতা থেকে দেহ ও মনকে মুক্ত করে তুলতে পারে। পানাহার করার উপভোগ তখন মানুষের স্বভাবগত হয়ে যায়। এরূপ জান্নাতবাসীর অবস্থা। ইফতার করতে পারলে পার্থিব জীবনেই দুনিয়া থেকে বিরত হওয়া যায়। মূলত নিজে থেকে প্রকৃত ইফতার করা যায় না। যিনি নিজে ইফতার প্রাপ্ত হয়েছেন তিনিই কেবল অন্য ব্যক্তিকে ইফতার করাতে পারেন। অবশ্য অন্য কাউকে ইফতার করানো কষ্টসাধ্য ব্যাপার। যাকে ইফতার করানো হয় তার থেকে উন্নত মানের ব্যক্তি হলেন তিনি, যিনি ইফতার করিয়ে থাকেন। নিজে ইফতার প্রাপ্ত হওয়া অর্থাৎ মন থেকে দেহের আকর্ষণকে একেবারে বিচূর্ণ করা তথা পূর্ণ কামিয়াব না হলে অন্যকে ইফতার করানো সম্ভবপর নয়। এটাই ইফতারের তাৎপর্য। এমন সংযমী তথা সৃষ্টির মোহবন্ধন থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত অর্থাৎ ‘ফাতারা’ অর্জিত ব্যক্তিরা ফিতরা প্রদান করে সমাজের অসহায়দের সঙ্গে আত্মিক বন্ধন দৃঢ় করতে সক্ষম হয় এবং ঈদের মাধ্যমে ব্যক্তি নিজেকে বৃহত্তর কল্যাণকর উম্মাহর অংশ হিসেবে অনুভব করে।

অন্যদিকে ঈদুল আজহা আধ্যাত্মিকতার আরও গভীর স্তরে নিয়ে যায়। এই ঈদের কেন্দ্রীয় শিক্ষা হযরত ইবরাহিমের (আ.) নিঃশর্ত আনুগত্য এবং হযরত ইসমাঈলের (আ.) আত্মসমর্পণ। কুরবানির মাধ্যমে মানুষ প্রতীকীভাবে ঘোষণা করে যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সে তার সবচেয়ে প্রিয় বিষয় ত্যাগ করতেও প্রস্তুত। পশু কুরবানি ঈদের একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। প্রকৃতপক্ষে, এখানে কুরবানি পশুর রক্ত বা মাংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি মানুষের অহংকার, লোভ ও আত্মকেন্দ্রিকতার কুরবানি। কুরআনের ভাষায়, আল্লাহর কাছে পৌঁছায় মানুষের তাকওয়া অর্থাৎ মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি ব্যক্তির কর্তব্যপরায়ণতা ও অন্তরের বিশুদ্ধতা।

ঈদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ‘তাকওয়া’ তথা কর্তব্যপরায়ণতা। সুতরাং, তাকওয়া যিনি অর্জন করেন তিনি হন মুত্তাকি অর্থাৎ কর্তব্যপরায়ণ। মুত্তাকি দুনিয়ার কলুষ থেকে মুক্ত। তাকওয়া মানে শুধু ভয় নয়, বরং আল্লাহর ভূষণ ও তাঁর গুণাবলি ও উপস্থিতি সম্পর্কে সার্বক্ষণিকের সচেতন অনুভব; যা মানুষকে প্রতিটি কাজে ন্যায় ও সংযম বজায় রাখতে উদ্বুদ্ধ করে। ঈদ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ধর্মীয় জীবন শুধু আনুষ্ঠানিক ইবাদতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দৈনন্দিন আচরণ, সামাজিক দায়িত্ব ও মানবিক সম্পর্কের মধ্যেও তার প্রতিফলন থাকা জরুরি।

মনের ত্রুটিমুক্ত অবস্থার উত্তরণ তথা হজ্ব সমাপণ দ্বারা পরিপূর্ণ আত্মদর্শন লাভ করে পরমের জ্ঞানে জ্ঞানী হয়ে মানব সেবায় আত্মনিয়োগ করার নাম কুরবানি। সুতরাং, সালাতের অনুশীলন ছাড়া কুরবানি করা অসম্ভব। এইরূপে দেখা যায়, সালাত কুরবানির চাবিকাঠি। আল-কুরআনে কুরবানি বুঝাতে যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা হলো, ‘জবেহ’। ‘জবেহ’ অর্থ পবিত্র করা, শুদ্ধ করা। জিন ও ইনসান জাতির মস্তিষ্কের অপবিত্রতা ও কলুষ-কালিমা ধোলাই করে শুদ্ধ ও পবিত্র করে তোলার জন্যই কুরবানি। সমাজ শুদ্ধির জন্য প্রতিটি সমাজের দুই-একজনকে কুরবানির এই আত্মবলিদান দিতেই হবে। নয়তো প্রকৃত সমাজকল্যাণ সুদূর পরাহত।

অনেকের কাছে ঈদের আনন্দ বাহ্যিক মনে হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে এই আনন্দও আধ্যাত্মিকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানো, দরিদ্র ও বঞ্চিতদের মুখে হাসি ফোটানো, পুরোনো বিরোধ ভুলে ক্ষমা ও সম্প্রীতির পথে এগিয়ে যাওয়া—এসবই আত্মাকে প্রশান্ত ও পবিত্র করে। এই আনন্দ অহংকারমুক্ত হলে তা ইবাদতে পরিণত হয়।

তবে ঈদের প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয় উৎসবের পর। রমজানের সংযম বা কুরবানির আত্মসমর্পণ যদি ঈদের দিনেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে আধ্যাত্মিক লক্ষ্য পূরণ হয় না। ঈদ মানুষকে আহ্বান জানায় একটি উন্নত নৈতিক ও আত্মিক জীবনের দিকে; যেখানে ইবাদত, ন্যায়বোধ ও মানবিকতা সারা বছর বজায় থাকে। যেমনটি আমাদের জাতীয় কবি কাজি নজরুল ইসলাম তাঁর বিখ্যাত ইসলামি গানের মধ্যে বিষয়টি তুলে ধরেছেন—

ও মন, রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানি তাগিদ।

নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার জন্য যে ‘আসমানি তাগিদ’ অর্থাৎ জরুরি ঐশী নির্দেশ; তা মনকে শুদ্ধ, বুদ্ধ বা পবিত্র করার নির্দেশ। আপন ‘মন’ যদি প্রতীকী একটি মাসের রোজার শেষে তথা রমজানে সংযমের অনুশীলন পূর্ণ করে, কেবল তখনই সাধকচিত্তে উপলব্ধ হয় নির্মল আনন্দ। এই আনন্দ নিজকে পরিপূর্ণ বিলিন করার অনাবিল অসীম আনন্দ বা খুশির ঈদ।

তোর সোনা-দানা বালাখানা সব রাহে লিল্লাহ
দে যাকাত মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিঁদ।

রাহে অর্থ পথ, রাস্তা বা উপায়। লিল্লাহ অর্থ আল্লাহর জন্য। প্রত্যেকটি মানুষ জাগতিকভাবে খালি হাতে আসে এবং খালি হাতেই ফিরে যায়। সেক্ষেত্রে ‘সোনা-দানা বালাখানা’ সব কিছু আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দেওয়ার জন্য, না হলে আমিত্বের পূর্ণবিসর্জন হয়ে ওঠে না। মানবীয় আমিত্বের উৎসর্গের নামই যাকাত। যাকাত কোনো বস্তুগত দান নয়, বরং মনের মধ্যে মহা শূন্যভাব জেগে ওঠাই যাকাত। এরূপ যাকাত দিয়ে মৃত মুসলিমকে বস্তুমোহের বিভর ঘুম ভাঙিয়ে জীবন্ত করার আহ্বান করা হয়েছে।

আজ পড়বি ঈদের নামাজ রে মন সেই সে ঈদগাহে
যে ময়দানে সব গাজী মুসলিম হয়েছে শহীদ।

ঈদের নামাজ খুশির সংযোগ। নিজের মনকে ‘সেই সে ঈদগাহে’ অর্থাৎ সেই সুনির্দিষ্ট আনন্দধামে সংযোগের মাধ্যমে একাত্ম বা সংযুক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। আত্মত্যাগের যে ময়দানে মানুষ-মানবীয় আমিত্বের উৎসর্গ দ্বারা গাজী, মুসলিম ও শহিদের মর্যাদা প্রাপ্ত হয়, আপন মনকে এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমন, হাত মেলাও হাতে
তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরিদ।
একজন মানুষ যখন প্রেমের মানুষে রূপান্তরিত হয়, সেই প্রেমময় মানুষটি তখন ‘দোস্ত-দুশমন’ জাত-ভেদ ও ধর্মীয় বিধি-নিষেধের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে এবং তার প্রেম দিয়ে ‘বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরিদ’ তথা নিখিল বিশ্বের সামগ্রিকতা তার প্রেমে শান্তির আনুগত্য করে, যা প্রকৃত মুরিদী।

ঢাল হৃদয়ের তোর তশ্‌তরিতে র্শি‌নি তৌহিদের
তোর দাওয়াত কবুল করবে হজরত হয় মনে উম্মীদ।

তশ্‌তরি একটি পাত্র বিশেষ। যে মানুষের হৃদয় প্র্রশস্ত ও একাত্ববাদের অবস্থায় সর্বজনীন আপ্যায়নে অবতীর্ণ হয়, সেই মানুষের নিমন্ত্রণ কবুল করা হবে বলে এখানে প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে।

তোরে মারল ছুড়ে জীবনজুড়ে ইট পাথর যারা
সেই পাথর দিয়ে তোল রে গড়ে প্রেমেরই মসজিদ।

মসজিদ শব্দটির অন্তর্নিহিত ভাবধারা বিশেষ অনুধাবনের বিষয়। তা বুঝতে না পারলে মসজিদে গমনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্বন্ধে মানুষের পূর্ণপরিচয় লাভ হয় না। মসজিদকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। নিরাকার ও সাকার। ভিতর ও বাহির। প্রত্যেক বিষয়ের এই দুইটি দিক আছে। অভ্যন্তরীণ তত্ত্ব না বুঝলে বাহিরের দিকটি নিরর্থক ও মূল্যহীন। আবার বাহির বা ওর সাকার অস্তিত্ব না থাকলে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তার অভ্যন্তরীণ মূল্যবোধ জাগ্রত হয় না। এজন্য সামাজিক দিক থেকে বাহিরের প্রয়োজন অত্যধিক। পক্ষান্তরে ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো কেবল বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা হয়ে পড়ে— যা প্রাণহীন ও অবহেলার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

ইসলামি চিন্তাধারার মূলভিত্তি মসজিদ। মসজিদকে বাদ দিয়ে কোনো কর্ম করলে তা হয় দুনিয়া। দুনিয়া মুসলমানের জন্য অতিথিশালা। আজ পৃথিবীর বুকে ইসলামি মতবাদের এই মূলভিত্তি ওহাবি মতবাদের প্রবল চাপের মুখে একেবারেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। তাই কুরআন-হাদিসের মসজিদকে বাদ দিয়া ইট-পাথরে গড়া মসজিদকেই দুনিয়ার মুসলমান আঁকড়ে ধওে আছে। মসজিদের বাহিরে থেকে জীবনযাপন করলেও তেমন আপত্তির কারণ থাকে না যদি মসজিদ পরিচয় ঠিক রেখে তাতে প্রবেশ করার চেষ্টা করা হতো। তা না করে শুধু ইট-পাথরের মসজিদকে আঁকড়ে ধরা আর হীরা ফেলে আঁচলে কয়লা গিরা দেওয়া, একই কথা।

সিজদাহ থেকে মসজিদ শব্দের উৎপত্তি। মসজিদ অর্থ সিজদার স্থান। কাজেই সিজদাহ শব্দের প্রকৃত ভাব জেনে নেওয়া দরকার। আমরা সিজদাহ বলতে স্রষ্টার কাছে মস্তক অবনত করে আত্মসমর্পণমূলক ভাব প্রকাশ করা বুঝে থাকি। কিন্তু এই কাজ সিজদার তথা আত্মসমর্পণের কেবল চেষ্টামাত্র। আমিত্বের লোপসাধন যখন হয় এবং নফস আপন অনুভূতি ও চেতনা থেকে যখন সরে যায়, তখনই হয় ব্যক্তির সিজদা। বৃক্ষাদি ও তারকাসমূহ কুরআন মতে সেজদায় আছে। এর অর্থ তারা নিজ ইচ্ছায় চলে না, চলার ক্ষমতাও নাই। মানুষের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যদি নিজ ইচ্ছা বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নিজেকে সমর্পিত কওে, তবেই হয় তার প্রকৃত সিজদা আপন প্রেমের মসজিদে।

পরিশেষে বলা যায়, ঈদ কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি মানুষ্যত্বের ধর্মের জাগরণ, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহমুখী জীবনের প্রতীক। ঈদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, বাহ্যিক আনন্দের আড়ালে সত্যিকারের সাফল্য নিহিত রয়েছে আত্মার পরিশুদ্ধিতে।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ