Views Bangladesh Logo

অচল ডব্লিউটিও, ভরসা এখন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি

বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর বাণিজ্য শক্তিই আজ কয়েক দশক ধরে গ্যাট এবং পরে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) অধীনে গড়ে ওঠা বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থার মৌলিক নীতিগুলো প্রকাশ্যে অগ্রাহ্য করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারী ও খামখেয়ালি শুল্ক পদক্ষেপ ‘মোস্ট ফেভার্ড নেশন’ (এমএফএন) বা সর্বাধিক অনুকূল রাষ্ট্র নীতির সরাসরি লঙ্ঘন।

এই মৌলিক নীতি অনুযায়ী, ডব্লিউটিওর কোনো সদস্যরাষ্ট্র সংস্থার অন্য সদস্য বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে বৈষম্য করতে পারে না। হারমোনাইজড সিস্টেমের (এইচএস) কোনো নির্দিষ্ট কোডে একটি বাণিজ্য অংশীদারকে যে শুল্কহার দেওয়া হয়, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডব্লিউটিওর অন্য সব সদস্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দেশভেদে ভিন্ন ও প্রতিনিয়ত বদলাতে থাকা শুল্কহার এই মূল নীতিরই লঙ্ঘন। বাণিজ্য অংশীদাররা ডব্লিউটিওর মাধ্যমে প্রতিকার খুঁজতে গিয়ে হতাশ হয়েছে। কারণ, কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ডব্লিউটিওর আপিল প্যানেলে বিচারক নিয়োগ আটকে রেখেছে; ফলে সংস্থাটির বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

তাই অকার্যকর ডব্লিউটিওকেন্দ্রিক বাণিজ্য বিধিব্যবস্থার বিকল্প খুঁজে নেওয়া এখন দেশগুলোর জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

কার্যকর সীমিত বহুপক্ষীয় ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি
দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিকে বলা হয় দ্বিপাক্ষিক, আর যে ব্যবস্থায় বিশ্বের সব বা প্রায় সব দেশ যুক্ত, তা বহুপক্ষীয়। এর মাঝামাঝি—দুইয়ের বেশি কিন্তু সব দেশ নয়—এমন আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থাকে বলা হয় সীমিত বহুপক্ষীয় বা প্লুরিল্যাটারাল চুক্তি। ডব্লিউটিও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা। রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি) একটি বৃহৎ সীমিত বহুপক্ষীয় চুক্তির উদাহরণ; তিনটি বড় অর্থনীতিকে একসূত্রে বাঁধা যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা চুক্তিও (ইউএসএমসিএ) তা-ই। অন্যদিকে ভারত-শ্রীলঙ্কা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (আইএসএলএফটিএ) দ্বিপাক্ষিক চুক্তির উদাহরণ।

২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষিত শুল্ক ঠেকাতে পারেনি ডব্লিউটিওর কাঠামো (যদিও পরে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট তা অবৈধ ঘোষণা করে); কিন্তু ইউএসএমসিএ সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত কার্যকর প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করেছে। ঘোষণার পরও ইউএসএমসিএর আওতাভুক্ত এইচএস কোডগুলোর ওপর আরোপিত শুল্ক শেষ পর্যন্ত প্রত্যাহার করতে হয়েছে। অন্য দেশগুলো যখন দুই অঙ্কের শুল্কহার সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিল, তখন কানাডার রপ্তানি আগের মতোই কোনো বাড়তি শুল্ক ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ঢুকছিল। পরিহাসের বিষয় হলো, এই ইউএসএমসিএ চুক্তিটি হয়েছিল ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেই; কারণ তিনি এর পূর্বসূরি উত্তর আমেরিকান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (নাফটা) নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন।

ইউএসএমসিএর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্যগুলোর একটি হলো এর রাষ্ট্র-রাষ্ট্র বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা। নাফটার আমলে কোনো এক পক্ষ প্যানেল সদস্য নিয়োগে অস্বীকৃতি জানিয়ে বা বিশেষজ্ঞ তালিকায় একমত না হয়ে প্যানেল গঠনই আটকে দিতে পারত; ফলে বিরোধ ঝুলে থাকত বছরের পর বছর। ইউএসএমসিএর অনুচ্ছেদ ৩১.৮ এই ত্রুটি দূর করেছে। এতে পূর্বানুমোদিত স্বাধীন বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের একটি স্থায়ী তালিকা রাখা হয়েছে; ফলে কোনো পক্ষ প্রক্রিয়া আটকাতে চাইলেও—যেমনটা যুক্তরাষ্ট্র ডব্লিউটিওতে এখনো করে যাচ্ছে—বিরোধ নিষ্পত্তি প্যানেল গঠন সম্ভব হয়।

এক পক্ষের ইচ্ছাকৃত লঙ্ঘন ঠেকানোর এই সক্ষমতা বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজতে থাকা সব দেশের জন্যই শিক্ষণীয়। এমএফএন এবং ‘ন্যাশনাল ট্রিটমেন্ট’ (বিদেশি সরবরাহকারীর প্রতি বৈষম্য না করা)—এই বৈষম্যহীনতার নীতিতে দাঁড়ানো বহুপক্ষীয় চুক্তিই তাত্ত্বিকভাবে সর্বোত্তম। কিন্তু একটি প্রধান বাণিজ্য শক্তি যখন নিয়ম ভাঙতে বদ্ধপরিকর, তখন তাত্ত্বিক সর্বোত্তমের আলোচনা অর্থহীন। লক্ষণীয়, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ২০২৭ সালে নির্ধারিত ইউএসএমসিএর নিয়মিত নবায়ন আটকে দিয়ে চুক্তিটি সংশোধন বা তা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছে। আর সম্প্রতি কানাডার পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক ঘোষণার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত ইউএসএমসিএ উড়িয়েই দিয়েছে। বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এই ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারবে কি না, তা এখন দেখার বিষয়।

এই প্রেক্ষাপটে দেশগুলোর উচিত যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্য দেশগুলোর সঙ্গে এমন দ্বিপাক্ষিক ও সীমিত বহুপক্ষীয় চুক্তিতে মনোযোগ দেওয়া, যেখানে ইউএসএমসিএর অনুচ্ছেদ ৩১.৮-এর মতো কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা থাকবে। ট্রাম্প প্রশাসনের সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার মধ্যে এ ধরনের চুক্তি দেশগুলোকে একধরনের স্থিতিশীলতা দেবে। যেসব কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিয়ত বদলাতে থাকা শুল্ক ব্যবস্থার রোলারকোস্টারে চড়তে রাজি, তারা সেই বৃহৎ বাজারে ব্যবসা চালিয়ে যেতেই পারে। কিন্তু তারা যেসব দেশে অবস্থিত, সেই দেশগুলোকে মার্কিন নীতির খামখেয়ালিপনা থেকে সুরক্ষিত থাকতে হবে।

কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তি
২০০০ সাল থেকে কার্যকর ভারত-শ্রীলঙ্কা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে (আইএসএলএফটিএ) কোনো কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা নেই। এটি নির্ভর করত দুই দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপের ওপর, যা বাণিজ্যবহির্ভূত নানা প্রভাবের কাছে অরক্ষিত ছিল। আধুনিক বাণিজ্য চুক্তিগুলোতে সালিসি ও আপিলের ধারা থাকে; আর ডব্লিউটিও প্রক্রিয়ায় মার্কিন বাধার পর এখন এমন বিধানও যুক্ত হচ্ছে, যাতে কোনো পক্ষ প্যানেল সদস্য মনোনয়নে অস্বীকৃতি জানালেও তা অতিক্রম করা যায়। ইউএসএমসিএর অনুচ্ছেদ ৩১.৮-এর মতো স্পষ্ট না হলেও আরসিইপিতে অচলাবস্থা ভাঙার বিধান রয়েছে।

তবে নতুন কিছু বাণিজ্য চুক্তির মতো আরসিইপি বেসরকারি বিনিয়োগকারী বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ দেয় না। ইউএসএমসিএ বিনিয়োগকারী-রাষ্ট্র বিরোধ নিষ্পত্তি (আইএসডিএস) ব্যবস্থার পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে এটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হয়েছে; আর যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর মধ্যে এখন তা কেবল তেল-গ্যাস, বিদ্যুৎ উৎপাদন, টেলিযোগাযোগ, পরিবহন ও অবকাঠামোর মতো সীমিত কিছু খাতেই প্রযোজ্য।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) এক বিস্তৃত গবেষণা অনুযায়ী, মেক্সিকোয় কানাডীয় বিনিয়োগকারীরা এবং কানাডায় মেক্সিকান বিনিয়োগকারীরা এখনো কম্প্রিহেনসিভ অ্যান্ড প্রগ্রেসিভ অ্যাগ্রিমেন্ট ফর ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপের (সিপিটিপিপি) অধীনে আইএসডিএস দাবি উত্থাপন করতে পারেন; অর্থাৎ আওতাভুক্ত বিনিয়োগ ও বিনিয়োগ সুরক্ষা লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে এটি একটি বিকল্প পথ খোলা রেখেছে।

দর-কষাকষির সক্ষমতা
বিরোধ নিষ্পত্তির এই সূক্ষ্ম দিকগুলোই বুঝিয়ে দেয়, বাংলাদেশের মতো দেশ যখন জটিল দ্বিপাক্ষিক ও সীমিত বহুপক্ষীয় চুক্তি সইয়ের অনিবার্য হয়ে ওঠা পথে হাঁটবে, তখন দক্ষ ও যোগ্য আলোচকের বিকল্প নেই। ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো দেশের একাধিক জটিল বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দর-কষাকষির অভিজ্ঞতা রয়েছে। আইএসএলএফটিএ ছিল শ্রীলঙ্কা ও ভারত—দুই দেশেরই প্রথম চুক্তি; কিন্তু মাহিন্দা রাজাপক্ষের প্রথম সরকারের সময় শ্রীলঙ্কা এ কাজ কার্যত বন্ধ করে দেয়। ফলে তাদের শেখাও থেমে যায়।

নতুন বাণিজ্য কাঠামো গড়তে চাওয়া সরকারের প্রয়োজন একটি বিশেষায়িত সংস্থা, যা বাণিজ্য আলোচকদের পরামর্শ দেওয়ার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পরামর্শকদের কাজ তদারক করবে; সরকারি সক্ষমতার বর্তমান অবস্থায় এমন পরামর্শক অপরিহার্য। বিষয়টিকে দেখতে হবে ২০২২ সাল থেকে শ্রীলঙ্কার জটিল সার্বভৌম ঋণ পুনর্গঠনে পরামর্শক ব্যবহারের মতো একটি কর্মপদ্ধতি হিসেবে। সেই সংস্থায় যদি যোগ্য দেশীয় জনবল থাকে, তাহলে তারাই ধাপে ধাপে পুরো দায়িত্ব বুঝে নিতে পারবে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ