দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্ক্যাম সেন্টারে চাকরির প্রলোভন, পাচারের শিকার শিক্ষিত বাংলাদেশিরা: জাতিসংঘ
উচ্চ বেতন, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে চাকরি এবং উন্নত জীবনযাপনের সুযোগের প্রলোভন দেখিয়ে শিক্ষিত বাংলাদেশিদের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁদের অনেককেই জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণা ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হচ্ছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি) এবং বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে মানব পাচারের এই নতুন প্রবণতার তথ্য উঠে এসেছে।
ইউএনওডিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাসে ৮০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার বেতনের চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রথমে আগ্রহী করা হয়। পরে লাইসেন্সধারী নিয়োগ এজেন্সি, অনানুষ্ঠানিক দালাল এবং বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে তাঁদের বিদেশে পাঠানো হয়। গন্তব্যে পৌঁছানোর পর অনেককে আটকে রেখে অনলাইন স্ক্যাম পরিচালনায় বাধ্য করা হয়। প্রায় ২০২২ সাল থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে জোরপূর্বক অপরাধে যুক্ত করতে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশিদেরও শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
‘ট্রাফিকড টু স্ক্যাম: সাউথ এশিয়ান রেসপন্সেস টু ট্রাফিকিং ইন পারসনস ফর দ্য পারপাস অব ফোর্সড ক্রিমিনালিটি ইন স্ক্যাম অপারেশনস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশিদের পাচারের উল্লেখযোগ্য গন্তব্য হিসেবে কম্বোডিয়া, লাও পিডিআর, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনলাইনে ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন প্রচারই পাচারকারীদের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত কৌশল। পাশাপাশি জেলা ও গ্রাম পর্যায়ে সক্রিয় লাইসেন্সধারী এজেন্সি এবং স্থানীয় দালালদের নেটওয়ার্কও এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকেও ভুক্তভোগীদের বড় একটি অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে শিক্ষিত। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের গবেষণায় দেখা গেছে, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ৬৪ জন এইচএসসি, ৪৮ জন এসএসসি, ২৫ জন স্নাতক এবং ৩ জন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। তাঁদের মধ্যে ৫৬ জন ঢাকার, ২৮ জন চট্টগ্রামের, ২৫ জন খুলনার এবং ২২ জন রাজশাহীর বাসিন্দা। বিদেশে যাওয়ার আগে ২২ জন শিক্ষার্থী এবং ১৬ জন বেকার ছিলেন। আবার ৫৭ জন জানিয়েছেন, তখন তাঁদের কোনো মাসিক আয় ছিল না; ৬০ জনের আয় ছিল ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, স্ক্যাম সেন্টারগুলো ইচ্ছাকৃতভাবেই শিক্ষিত তরুণদের টার্গেট করছে। কারণ এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ইংরেজি ভাষা ও কম্পিউটার ব্যবহারে দক্ষতা প্রয়োজন। তাঁর মতে, দেশে সাইবার স্ক্যাম সেন্টার গড়ে ওঠা এবং পরিচালনার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও দক্ষতাও ধীরে ধীরে সহজলভ্য হয়ে উঠছে। এ কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় এমন কয়েকটি কেন্দ্র গড়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।
ইউএনওডিসির নথিবদ্ধ একটি ঘটনাও পাচারের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। ২০২২ সালে বিশের কোঠার এক বাংলাদেশি যুবককে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে চাকরির কথা বলে কম্বোডিয়ার লং বে স্ক্যাম কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরিচিত এক বন্ধুর মাধ্যমে চাকরির প্রস্তাব পেয়ে তিনি রাজি হন। বিদেশে পাঠানোর জন্য তাঁর বাবা-মা জমি বন্ধক রেখে ৩ হাজার মার্কিন ডলার নিয়োগ ফি দেন। নমপেনে পৌঁছানোর পর বাংলাদেশি দালালেরা তাঁকে প্রথমে একটি অফিসে নিয়ে যায়। পরে সাক্ষাৎকারের নামে তাঁকে নমপেন থেকে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার দূরের দারা সাকোরের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবস্থিত লং বে কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়।
সেখানে গিয়ে ওই যুবক বুঝতে পারেন, তথ্যপ্রযুক্তির চাকরির পরিবর্তে তাঁকে অনলাইন প্রতারণায় যুক্ত করা হয়েছে। ইউএনওডিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁকে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে বিনিয়োগের বিভিন্ন স্কিমের মাধ্যমে মানুষকে প্রতারণা করতে বাধ্য করা হয়। নির্ধারিত কাজ বা লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে চালানো হতো নির্যাতন। এমনকি অন্য কর্মীদের মারধর করতেও তাঁকে বাধ্য করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্ক্যাম সেন্টারে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের শুধু প্রতারণা নয়, বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জোর করে যুক্ত করা এবং নির্যাতনের ঘটনাও নথিবদ্ধ হয়েছে।
মতামত দিন