Views Bangladesh Logo

দুর্গাপূজা: ধর্ম, ইতিহাস, সাহিত্য ও বাঙালির উৎসব-সংস্কৃতি

লেখাটির শুরুতেই আমরা এ যাবৎ প্রচলিত একটি ধারণা সংশোধন করে নিতে চাই। বহুবছর ধরে আমরা দুর্গাপূজাকে ‘শারদোৎসব’ বলি।

শরৎকালে অনুষ্ঠিত উৎসবকেই প্রকৃত অর্থে শারদোৎসব বলা উচিত। আমরা জানি, ভাদ্র ও আশ্বিন—এই দুই মাস শরৎকাল। কিন্তু ভারতীয় পঞ্জিকার বিন্যাসে দেখা যায়, যে বছর দুর্গাপূজা আশ্বিন মাসে অনুষ্ঠিত হয়, পরের বছর তা অবধারিতভাবে কার্তিক মাসে পড়ে, অর্থাৎ হেমন্ত ঋতুতে। তাই দুর্গাপূজাকে সর্বাংশে ও যথার্থ অর্থে শারদীয় উৎসব বলা যায় না। তবে ‘শারদোৎসব’ নামেই লোকমুখে ও সাহিত্যে এটি স্থায়ী আসন পেয়েছে।

ষোড়শ শতাব্দীর কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তাঁর ‘চণ্ডীমঙ্গল’ (প্রকৃত নাম ‘অভয়ামঙ্গল’) কাব্যে লিখেছেন, ‘আশ্বিনে অম্বিকা পূজা করে জনে জনে/ ছাগল মহিষ মেষ দিয়া বলিদানে।’ তেমনি এ যুগে রবীন্দ্রনাথও লিখেছেন, ‘আশ্বিনের মাঝামাঝি উঠিল বাজনা বাজি।’ এখন তাই দুর্গাপূজা শরতের, না হেমন্তের—সে সূক্ষ্ম বিচার নিয়ে অবকাশ কাটানোর প্রয়োজন নেই।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপাস্য দেবদেবীর সংখ্যা অনেক। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কালী, লক্ষ্মী, সরস্বতী, শিব, কৃষ্ণ, গণেশ ও কার্তিকেয়—যিনি বাঙালির কাছে ‘কার্তিক’ নামে পরিচিত। এ ছাড়া আছেন বিশ্বকর্মা, শীতলা, মনসা, মা ষষ্ঠী, দক্ষিণ রায় (বাঘের দেবতা), সন্তোষী মা, ছটের উপাস্য দেবতা ও কামাখ্যা। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নানা ভাষাভাষী ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস। প্রতিটি অঞ্চলে রয়েছে নিজস্ব দেবদেবীর উপাসনা ও পূজার ঐতিহ্য।

তামিলদের উপাস্য দেবতাদের মধ্যে রয়েছেন মুরুগান—যুদ্ধ ও সৌন্দর্যের দেবতা, যাঁকে কার্তিকেয়ের তামিল রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়; পেরুমল, যিনি তামিলদের কাছে বিষ্ণুর একটি রূপ; এবং মীনাক্ষী, যাঁকে পার্বতী বা দুর্গার সঙ্গে অভিন্ন বলে মনে করা হয়। অন্ধ্রপ্রদেশে পূজিত হন ভেঙ্কটেশ্বর ও ভ্রমরাম্বা। ওডিশায় রয়েছেন জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা। রাজস্থানে পূজিত হন গোগাজি (সর্পদেবতা) ও পাবুজি (উট ও গবাদিপশুর রক্ষাকর্তা)। পাঞ্জাবে সনাতন ধর্মাবলম্বী, শিখ ও মুসলমান—বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। সেখানে সূর্যদেব ও বাবা বালকনাথের উপাসনার প্রচলন রয়েছে। ওই অঞ্চলের কিছু যাযাবর সম্প্রদায় সাঁঝি মাতার পূজা করেন। রাজবংশী সম্প্রদায়ের মধ্যেও মাসাইয়ের আরাধনার প্রচলন রয়েছে।

আসলে বহুদেবতাবাদ মানবসভ্যতার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রাচীন মিসর, গ্রিসসহ পৃথিবীর বহু দেশে একসময় বহুদেবতাবাদ প্রচলিত ছিল। এমনকি প্রাক্‌-ইসলামি আরবের মক্কার উপাসনালয় কাবায়ও হুবাল বা হাবাল, আল-লাত, মানাত ও নাসরসহ বহু দেবতার মূর্তি ছিল বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রচলিত বিবরণ অনুসারে, সেখানে ৩৬০টি মূর্তি ছিল।

ভারতীয় ইতিহাসের বৈদিক পর্বে বিভিন্ন দেবতার উপাসনা এবং এক পরম সত্তার ধারণা পাশাপাশি বিকশিত হয়েছে। অন্যদিকে ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, ইসলাম প্রবর্তনের আগে আরবে বহু দেবতার উপাসনা প্রচলিত ছিল। ইসলামের প্রবর্তক মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) একমাত্র আল্লাহর উপাসনার বাণী প্রচার করেন। এর মধ্য দিয়ে ইসলাম একেশ্বরবাদী ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা সাধারণত ষষ্ঠী থেকে দশমী—এই পাঁচ দিন ধরে চলে। তবে পঞ্চমীকেও অনেক সময় উৎসবের পরিসরে ধরা হয়। এ দিন মণ্ডপে প্রতিমা আনা হয় এবং পুষ্প ও প্রদীপের সাহায্যে স্কন্দমাতার পূজার আয়োজন করা হয়ে থাকে। তিথির ব্যাপ্তি অনুসারে কখনো উৎসব চার দিন, কখনো ছয় দিন স্থায়ী হয়। ২০২৬ সালে সপ্তমী তিথি দুদিন বিস্তৃত হওয়ায় উৎসব ছয় দিন ধরে চলবে; পঞ্চমীকে হিসাবের মধ্যে ধরলে সাত দিন।

এত দীর্ঘ সময় ধরে অন্য কোনো দেবদেবীর পূজা সাধারণত কোথাও অনুষ্ঠিত হয় না। দুর্গাপূজার এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। এর আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এ উপলক্ষে অসংখ্য পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হয়। কলকাতা যেহেতু দুর্গাপূজার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র, তাই স্বাভাবিকভাবেই সেখান থেকে সবচেয়ে বেশি পূজাসংখ্যার পত্রিকা প্রকাশিত হয়। দৈনিক সংবাদপত্রগুলোও এ সময় বিশেষ আয়োজনের মধ্য দিয়ে পূজাসংখ্যা প্রকাশ করে।

প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায়ের লেখালেখির যে দুটি ভিন্নধর্মী ক্ষেত্র তাঁকে দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রেখেছিল, তার মধ্যে ‘দেশ’ ও ‘আনন্দমেলা’ পত্রিকার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, প্রবীণ লেখকদের পাশাপাশি প্রতিবছর পূজাসংখ্যায় একজন নবীন লেখকের উপন্যাস প্রকাশ করবেন। এই উদ্যোগের মধ্য দিয়েই আমরা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও বুদ্ধদেব গুহের মতো ঔপন্যাসিকদের জনপ্রিয় হয়ে ওঠার ইতিহাসের সাক্ষী হয়েছি।

বাণিজ্যিক পত্রপত্রিকার তুলনায় বহুগুণ বেশি প্রকাশিত হয় অবাণিজ্যিক পত্রিকা। বিষয়বৈচিত্র্যেও এসব পত্রিকা পাঠকদের বিস্মিত করে। কেউ প্রকাশ করেন মূকাভিনয়বিষয়ক একটি পূর্ণাঙ্গ পত্রিকা, কেউবা নদী, রেড ইন্ডিয়ান সাহিত্য, কোনো বিখ্যাত মনীষী, শ্মশান, সুন্দরবন কিংবা শতবর্ষী মানুষদের নিয়ে বিশেষ সংখ্যা।

ঐতিহাসিকদের মতে, ১৮৯২ সালে (বাংলা ১২৯৯) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘সাধনা’ পত্রিকাটি সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ শারদীয় সংখ্যার দাবিদার। পত্রিকাটির তৎকালীন সম্পাদক ছিলেন কবির ভ্রাতুষ্পুত্র সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এতে রবীন্দ্রনাথের ‘স্বর্ণমৃগ’ গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল। পরে ১৯১৩ সালে ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকাটি প্রথমবারের মতো পূজার সময় বিশেষভাবে সজ্জিত হয়ে প্রকাশিত হয়। সেই থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এ সময়ে গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধে সমৃদ্ধ কত পত্রিকা যে প্রকাশিত হয়েছে, তা নিয়ে এক ডজন গবেষণাগ্রন্থ রচনা করা সম্ভব।

তবে এই ইতিহাসের কিছু বিষণ্নতাময় দিকও রয়েছে। একসময় এ সময়ে বেশ কিছু অসাধারণ পত্রিকা প্রকাশিত হতো। যেমন ‘এক্ষণ’, ‘বিভাব’, ‘প্রতিক্ষণ’, ‘বারোমাস’, ‘প্রমা’, ‘বর্তিকা’ প্রভৃতি। পাঠকেরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন, কবে পত্রিকাগুলো প্রকাশিত হবে। ‘এক্ষণ’ প্রতিবছর সত্যজিৎ রায়ের চিত্রনাট্য প্রকাশ করত বলে পত্রিকাটির প্রতি পাঠকদের আগ্রহ ছিল তুঙ্গে।

কী আশ্চর্য সমাপতন! ‘আগন্তুক’-এর চিত্রনাট্য প্রকাশিত হওয়ার কিছুদিন পরেই সত্যজিৎ রায় প্রয়াত হন। আর সেই চিত্রনাট্য মুদ্রিত হয়ে বাজারে আসার আগেই মারা যান পত্রিকাটির সম্পাদক নির্মাল্য আচার্য। প্রথম দিকে এ পত্রিকার সঙ্গে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও যুক্ত ছিলেন। পরে নির্মাল্য একাই পত্রিকাটি পরিচালনা করতেন।

এবার আবার দুর্গাপূজার প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক।

উপমহাদেশে দেবী দুর্গার উল্লেখ প্রাচীন উপনিষদীয় সাহিত্যে পাওয়া যায়। কেনোপনিষদে উমার আবির্ভাবের কথা রয়েছে; সেখানে তিনি জগতের চালিকাশক্তির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন। যুগে যুগে এই দেবীর রূপ ও উপাসনার ধারায় বিবর্তন ঘটেছে। প্রাচীনকালে তিনি বনদুর্গা রূপেও পূজিত হতেন। প্রাচীন অরণ্যনির্ভর সমাজজীবনে বনদেবীর গুরুত্ব সহজেই অনুমেয়।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির কাছে বৈকুণ্ঠপুরের জঙ্গলে আজও পৌষ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে বনদেবীর পূজা হয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেবী চৌধুরাণী’ উপন্যাসে ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরাণীর গোপন আস্তানা এবং আরাধনার স্থান হিসেবেও এই অঞ্চলের উল্লেখ রয়েছে।

দেবী শাকম্ভরীও দুর্গার আরেক রূপ। মার্কণ্ডেয় পুরাণে বর্ণিত আছে, দুর্গমাসুর একশো বছর ধরে পৃথিবীতে অত্যাচার চালায়। তার ফলে অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষে পৃথিবী বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তখন দেবী পার্বতী শাকম্ভরীর রূপ ধারণ করে নিজের শরীর থেকে ফলমূল উৎপন্ন করেন এবং পৃথিবীর মানুষের ক্ষুধা নিবারণ করেন। পরে তাঁর হাতেই নিহত হয় দুর্গমাসুর। এই অসুরকে বধ করার কাহিনির সঙ্গে দেবীর ‘দুর্গা’ নামের ব্যাখ্যাও যুক্ত হয়েছে। শাকম্ভরী দেবীও পৌষ পূর্ণিমায় পূজিত হন। বিশেষত রাজস্থানের শাকম্ভরী পীঠ এবং উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুরের শক্তিপীঠে তাঁর পূজার প্রচলন রয়েছে।

দুর্গাপূজার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ নবপত্রিকা। ‘নবপত্রিকা’ অর্থ নয়টি উদ্ভিদ বা গাছের সমষ্টি। প্রতিটি উদ্ভিদকে দুর্গার বিভিন্ন রূপ বা দেবীর প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যেমন কলা বা কদলী ব্রহ্মাণী, কচু কালিকা, হলুদ উমা, বেল শিবা, ডালিম রক্তদন্তিকা, অশোক শোকরহিতা, মানকচু চামুণ্ডা এবং ধান লক্ষ্মীর প্রতীক। নবপত্রিকার সঙ্গে বিভিন্ন দেবীর নাম যুক্ত হওয়ার বিষয়টি কৌতূহলোদ্দীপক। এই পূজা যে প্রাথমিকভাবে কৃষিভিত্তিক ছিল এবং শস্যদেবীর আরাধনার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে, নবপত্রিকা তারই সাক্ষ্য বহন করে।

পণ্ডিত শশিভূষণ দাশগুপ্তের মতে, ‘এই শস্যবধূকেই দেবীর প্রতীক করিয়া প্রথমে পূজা করিতে হয়। তাহার কারণ শারদীয়া পূজা মূলে বোধ হয় এই শস্যদেবীরই পূজা। পরবর্তীকালের বিভিন্ন দুর্গাপূজার বিধিতে এই নবপত্রিকার বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হইয়াছে।’

বিষয়টি ভাবলে বিস্ময় জাগে। ধান ও লক্ষ্মীর মধ্যে সম্পর্ক সুপ্রতিষ্ঠিত হলেও লক্ষ্মী তো পৌরাণিক বিশ্বাসে দুর্গার কন্যা। তাহলে লক্ষ্মীর প্রতীক ধান কীভাবে স্বয়ং দুর্গার প্রতীক হয়ে উঠল?

নবপত্রিকার উদ্ভিদগুলো একত্র করে দুটি বেলকে দেবীর স্তনযুগল কল্পনা করে একসঙ্গে বাঁধা হয়। এরপর একটি কলাগাছের সঙ্গে সাদা অপরাজিতা লতা দিয়ে নবপত্রিকাটি বেঁধে দেবী দুর্গার ডান পাশে স্থাপন করা হয়। তার আগে পুরোহিতের নেতৃত্বে নবপত্রিকাকে নদী বা পুকুরে স্নান করিয়ে আনা হয়। নবপত্রিকার পূজার মধ্য দিয়েই দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে।

সন্ধিপূজা

দুর্গোৎসবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্বগুলোর একটি হলো সন্ধিপূজা। অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিট—মোট ৪৮ মিনিট—সন্ধিপূজার নির্ধারিত সময়।

সন্ধিপূজার প্রকৃত তাৎপর্য কোথায়?

পুরাণের কাহিনি অনুসারে, দৈত্যরাজ শুম্ভ-নিশুম্ভের সেনাপতি ছিল চণ্ড ও মুণ্ড নামে দুই অসুর। দেবী দুর্গা যখন মহিষাসুরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত, তখন এই দুই অসুর তাঁকে আক্রমণ করে। দেবী নিজের তৃতীয় নয়নের শক্তি থেকে চামুণ্ডার রূপ ধারণ করে তাদের বধ করেন। এই কাহিনিই চণ্ড-মুণ্ড বধ নামে পরিচিত।

প্রচলিত লোককাহিনিতে দেবীর শরীরের ১০৮টি স্থানে আঘাত লাগার কথাও বলা হয়। এ কারণে মহাদেব তাঁকে দেবীদহে স্নান করার পরামর্শ দেন। সেখানে ১০৭টি পদ্ম দেবীর ক্ষতস্থান ঢেকে দেয়। বাকি ক্ষতটি মহাদেবের অশ্রুজলে নিরাময় হয় এবং সেখানে একটি পদ্মের জন্ম হয়—এমন বর্ণনাও প্রচলিত রয়েছে। তবে এই কাহিনির বিভিন্ন সংস্করণ রয়েছে; তাই একে সর্বজনস্বীকৃত পুরাণবর্ণনা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

সন্ধিপূজায় ১০৮টি পদ্মফুল ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। এ ছাড়া জবাফুলও ব্যবহার করা হয়। এ সময় চামুণ্ডা দেবীরও পূজা করা হয়। চণ্ড-মুণ্ড বধের পৌরাণিক কাহিনির সঙ্গে সন্ধিপূজার বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে বলেই এই পর্বকে দুর্গোৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আচার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

রামায়ণের কাহিনিতেও দুর্গাপূজার উল্লেখ রয়েছে। রাবণকে বধ করার আগে রাম দেবী দুর্গার আশীর্বাদ লাভের জন্য তাঁর পূজা করেন। রামের পূজার জন্য ১০৮টি পদ্মের প্রয়োজন হলে হনুমান সেগুলো সংগ্রহ করে আনেন। রামের ভক্তি পরীক্ষা করার জন্য দেবী একটি পদ্ম লুকিয়ে রাখেন। তখন রাম নিজের চোখ উপড়ে দেবীকে অর্পণ করতে উদ্যত হন। কারণ, লোকশ্রুতি অনুসারে, রাম পদ্মপলাশলোচন—অর্থাৎ তাঁর চোখ পদ্মের পাপড়ির মতো। রামের ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে দেবী তাঁকে বাধা দেন এবং লুকিয়ে রাখা পদ্মটি ফিরিয়ে দেন। এই কাহিনি রামের অকালবোধন ও দুর্গাপূজার সঙ্গে যুক্ত। তবে সন্ধিপূজার সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যাখ্যা প্রচলিত রয়েছে।

এসব পৌরাণিক কাহিনি ও আচার-অনুষ্ঠানের কারণেই সন্ধিপূজা দুর্গোৎসবে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে।

কুমারীপূজা

দুর্গাপূজার আরেকটি উল্লেখযোগ্য আচার হলো কুমারীপূজা। এটি তন্ত্রশাস্ত্রসমর্থিত একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান। যোগিনীতন্ত্র, যামলতন্ত্র ও কুলার্ণবতন্ত্রে এর বর্ণনা রয়েছে। সপ্তদশ শতাব্দীতে নদীয়ার বিখ্যাত পণ্ডিত কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের ‘তন্ত্রসার’ গ্রন্থেও কুমারীপূজার উল্লেখ পাওয়া যায়। নারীর মধ্যে পরমার্থের উপলব্ধিই এই পূজার মূল ভিত্তি।

এখানে ‘কুমারী’ বলতে এমন কন্যাকে বোঝানো হয়, যার ঋতুস্রাব শুরু হয়নি। শাস্ত্রানুসারে, এক থেকে ষোলো বছর বয়সী কন্যাদের কুমারীরূপে পূজা করা যেতে পারে। বয়সভেদে তাঁদের বিভিন্ন নামও নির্ধারিত হয়েছে। যেমন সন্ধ্যা, সরস্বতী, ত্রিধামূর্তি, কালিকা, সুভগা, উমা, মালিনী, কুব্জিকা, কালসন্দর্ভা, অপরাজিতা, রুদ্রাণী, ভৈরবী, মহালক্ষ্মী, পীঠনায়িকা, ক্ষেত্রজ্ঞা এবং অন্নদা বা অম্বিকা। মহাষ্টমীর দিন সাধারণত কুমারীপূজা অনুষ্ঠিত হয়।

এই প্রথার প্রাচীনত্বের প্রমাণ হিসেবে বাংলায় ‘কুমারীপূজাপ্রয়োগ’ নামে একটি পাণ্ডুলিপির সন্ধান পাওয়া যায়, যা ঢাকার বাংলা একাডেমিতে সংরক্ষিত রয়েছে। পাণ্ডুলিপিটির নম্বর ১৫৯। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে রামকৃষ্ণ মিশন পরিচালিত দুর্গাপূজায় কুমারীকে মাতৃজ্ঞানে আরাধনা করা হয়। এই প্রথা জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে স্বামী বিবেকানন্দের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

১৮৯৮ সালে কাশ্মীরে স্বামী বিবেকানন্দ একটি মুসলমান কন্যাকে কুমারীরূপে পূজা করেছিলেন বলে প্রচলিত বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ঘটনাটি সে সময়ের সামাজিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। পরে ১৯০১ সালে বেলুড় মঠে দুর্গাপূজা শুরু হলে সেখানে একাধিক কুমারীর পূজা করা হয়। তাঁদের মধ্যে চারজনকে স্বামী বিবেকানন্দ নিজে পূজা করেছিলেন বলে জানা যায়। সেই থেকে বেলুড় মঠে দুর্গাপূজার সময় কুমারীপূজার প্রথা চলে আসছে।

বাংলাদেশেও রামকৃষ্ণ মিশন পরিচালিত বিভিন্ন কেন্দ্রে কুমারীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা, হবিগঞ্জ ও দিনাজপুরের মিশনকেন্দ্রগুলোতে এ আয়োজন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

পুরাণে কুমারী বা দেবীরূপে পূজিত কন্যার সঙ্গে অসুরবধের কাহিনিও যুক্ত হয়েছে। একটি প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, দেবী বাণাসুরকে বধ করেছিলেন।

কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, নেপালেও কুমারীপূজার প্রচলন রয়েছে। দুর্গোৎসবের সময় ছাড়াও বছরের বিভিন্ন সময়ে এই আচার পালিত হয়। নেপালের জীবন্ত দেবী বা ‘কুমারী’ প্রথায় সাধারণত বয়ঃসন্ধির আগের কন্যাদের নির্বাচন করা হয়। তাঁদের বয়স, শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও অন্যান্য ধর্মীয় মানদণ্ড বিবেচনা করে নির্বাচন করা হয়। প্রথা অনুযায়ী, জীবন্ত দেবীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পরও তাঁদের জন্য ভাতা বা পেনশনের ব্যবস্থা রয়েছে।

নেপালে শুধু হিন্দুরাই নন, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষও কুমারীকে দেবীর জীবন্ত রূপ হিসেবে শ্রদ্ধা করেন। তাঁরা কুমারীকে তালেজু ভবানী বা দুর্গা-কালীর জীবন্ত প্রতিরূপ বলে মনে করেন। নেপালের ঐতিহাসিক নগরী ভক্তপুরে মধ্যযুগ থেকেই এই প্রথার প্রচলন রয়েছে। শাক্য বা বজ্রাচার্য বৌদ্ধ পরিবারের কন্যাদের মধ্য থেকে সাধারণত জীবন্ত দেবী নির্বাচিত হন।

বাংলায় অবশ্য কুমারীপূজার ক্ষেত্রে জাতি ও ধর্মের পরিচয় সব সময় একইভাবে বিবেচিত হয়নি। তাত্ত্বিকভাবে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কন্যাকে কুমারীরূপে পূজার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে ব্রাহ্মণ কন্যাদেরই অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্বাচন করা হয়।

উল্লেখ্য, নেপালের সজনী শাক্য নামের এক জীবন্ত দেবীকে নিয়ে ব্রিটিশ চলচ্চিত্র নির্মাতা অ্যালান ইরেইরা ‘The Living Goddess’ নামে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন।

দুর্গাপূজার কাহিনি ও এর আনুষঙ্গিক বিষয়ের পরিসর এককথায় অফুরন্ত। আমরা এখানে এর বৈচিত্র্য ও ব্যাপ্তির একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্যান্ডেল নির্মাণ, দেবী দুর্গা ও তাঁর সহযোগী দেবদেবীদের প্রতিমার নান্দনিকতা, পূজার ভোগ, অঞ্জলি ও ভুরিভোজ, ঢাকের বাদ্য, দলবেঁধে পূজামণ্ডপে ঘুরে বেড়ানো, তরুণ-তরুণীদের প্রেম, নতুন পোশাকে সাজগোজ এবং উৎসবের নানা সামাজিক অনুষঙ্গ।

সবশেষে রয়েছে বিসর্জনের আগে বিবাহিত নারীদের দেবীবরণ ও সিঁদুরখেলা। তারপর শুরু হয় অপেক্ষা—আরও একটি বছরের, দেবীর পুনরাগমনের। এই প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষাই দুর্গোৎসবকে প্রতিবছর নতুন করে প্রাণবন্ত করে তোলে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ