মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু দুর্গাপূজা
বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা আজ মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে। সকালে কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয় পাঁচ দিনব্যাপী এই উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা, যা চলবে আগামী ২১ অক্টোবর পর্যন্ত।
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস সাধন জানান, সকালে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজার মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে।
মহাষষ্ঠীতে দেবী দুর্গার বোধন ও আবাহন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে দেবীকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাগ্রত ও আমন্ত্রণ জানানোর ধর্মীয় আচার সম্পন্ন হয়।
আগামীকাল শনিবার মহাসপ্তমীর মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। এ বছর বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী, সপ্তমী তিথি শনিবার ও রোববার—দুই দিন পড়েছে।
মহাসপ্তমীতে নবপত্রিকা পূজা অনুষ্ঠিত হবে। এ আচার অনুযায়ী, দেবীর বিভিন্ন রূপের প্রতীক হিসেবে নয়টি উদ্ভিদকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্নান করিয়ে পূজা করা হয়।
সোমবার উদ্যাপিত হবে মহাষ্টমী। এদিন অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হবে বিশেষ ধর্মীয় আচার সন্ধিপূজা।
এরপর মহা নবমীতে দুর্গাপূজার অন্যতম প্রধান পূজার্চনা ও ভোগ নিবেদন করা হবে।
উৎসবের শেষ দিনে বিজয়া দশমীতে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাবেন ভক্তরা। এদিন শোভাযাত্রা করে প্রতিমা নির্ধারিত নদী, পুকুর বা অন্যান্য জলাশয়ে নিয়ে বিসর্জন দেওয়া হবে।
উৎসব শুরুর মাত্র দুই দিন আগে থেকেই প্রতিমাশিল্পী ও কারিগররা প্রতিমায় শেষ মুহূর্তের রং ও সাজসজ্জার কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। দেশের বিভিন্ন মন্দির ও অস্থায়ী পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। উৎসবকে ঘিরে মণ্ডপগুলো সাজানো হচ্ছে বর্ণিল আলোকসজ্জা ও নান্দনিক সাজে।
হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এ বছর নির্বাহী আদেশে দুর্গাপূজার সরকারি ছুটি তিন দিন করা হয়েছে। এর সঙ্গে নিয়মিত শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হওয়ায় ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের ছুটি উপভোগ করতে পারবেন সরকারি ছুটির আওতাভুক্ত কর্মজীবীরা।
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর বলেন, ‘এটি সত্যিই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। এমন সিদ্ধান্তের জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই।’
পাঁচ দিনের এই উৎসবকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন স্থানে পূজা কমিটি, মন্দির ও মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। মণ্ডপ নির্মাণ ও সাজসজ্জা, প্রতিমা স্থাপন, আলোকসজ্জা এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
উৎসব চলাকালে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নির্বিঘ্নে চলাচলের ব্যবস্থা করতে প্রশাসন ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীও কাজ করছে।
বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে দুর্গাপূজার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অপরিসীম। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, অসুররাজ মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবী দুর্গার বিজয়কে স্মরণ করে এই উৎসব পালন করা হয়। এটি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক।
পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, পুরুষের হাতে অবধ্য হওয়ার বর পেয়ে মহিষাসুর দেবতাদের জন্য হুমকি হয়ে ওঠেন। পরে দেবতারা তাঁদের সম্মিলিত ঐশ্বরিক শক্তি দিয়ে দেবী দুর্গার সৃষ্টি করেন। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে পরাজিত করেন।
গত ১০ অক্টোবর মহালয়া উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার আগমনবার্তা ঘোষণা করা হয়। এ উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ বিভিন্ন ধর্মীয় আচার পালন করেন।
দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পূজামণ্ডপগুলোতে বর্ণিল সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা ও শিল্পসম্মত নকশার কাজ চলছে। উৎসবের দিনগুলোতে এসব মণ্ডপে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের ব্যাপক সমাগমের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তাঁরা দেবীর পূজায় অংশ নেওয়া, প্রসাদ গ্রহণ এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।
দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই উৎসব হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে একত্রিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ ও সম্প্রীতির পরিবেশ তৈরি করে। এটি দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।
আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকার বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা, সরকারি অনুদান বৃদ্ধি এবং ছুটি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলোর জন্য সরকারি অনুদানের পরিমাণ ৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করা হয়েছে।
এ বছর সারা দেশে পূজামণ্ডপের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৮৫১টিতে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৫০০টি বেশি।
এদিকে, দুর্গাপূজায় নজরদারি জোরদার করতে জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (এনটিএমসি) আগে ব্যবহৃত একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন কাজে লাগাবে কর্তৃপক্ষ। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে অ্যাপটি সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পূজামণ্ডপগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিদ্যুৎ বা জেনারেটরে কোনো সমস্যা দেখা দিলে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে মণ্ডপের আয়োজকদের সার্বক্ষণিক জেনারেটর প্রস্তুত রাখা এবং রিচার্জেবল বাতি সংরক্ষণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
মতামত দিন