Views Bangladesh Logo

চার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আইসিটির অভিযোগ প্রত্যাহারের আহ্বান ৫ আন্তর্জাতিক সংস্থার

 VB  Desk

ভিবি ডেস্ক

আটক সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপাসহ চার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাসহ বিচারাধীন সব ফৌজদারি অভিযোগ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারবিষয়ক পাঁচটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। বুধবার (১৫ জুলাই) প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে সংস্থাগুলো বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, সাংবাদিকরা যেন তাদের পেশাগত প্রতিবেদনের কারণে কোনো ফৌজদারি অভিযোগের মুখোমুখি না হন—বিশেষ করে মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর অভিযোগে।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো হলো— অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, আর্টিকেল ১৯, সিভিকাস: ওয়ার্ল্ড অ্যালায়েন্স ফর সিটিজেন পার্টিসিপেশন, কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

বিবৃতিতে সংস্থাগুলো জানায়, প্রসিকিউটররা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তদন্তটি ২০১৩ সালের ৫–৬ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে ইসলামপন্থী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের বিক্ষোভের বিরুদ্ধে পরিচালিত নিরাপত্তা অভিযানের সংবাদ পরিবেশনা সংক্রান্ত, যেখানে নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ২০২৬ সালের ১৪ মে আইসিটি এই মামলায় রূপা ও বাবুকে গ্রেপ্তার দেখায়। রূপা বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল একাত্তর টিভির সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ও উপস্থাপক, আর বাবু চ্যানেলটির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধান সম্পাদক। এই বিবৃতি প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাদের আইনজীবীরা কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ বা অভিযোগপত্র (চার্জশিট) হাতে পাননি।

বিবৃতিতে বলা হয়, প্রসিকিউশন ইঙ্গিত দিয়েছে যে অভিযোগগুলো ২০১৩ সালের ঘটনাবলির সম্প্রচারিত সংবাদ পরিবেশনা সংক্রান্ত—যার মধ্যে রয়েছে রূপার উপস্থাপনায় একটি সমসাময়িক বিষয়ক অনুষ্ঠান, যেটি হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ‘বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছে’ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে ভূমিকা রেখেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের একটি মৌলিক দিক হলো সাংবাদিকতা পেশার সুরক্ষা। যার মধ্যে রয়েছে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রতিবেদন ও সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে যেখানে ঘটনাগুলো রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত বা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। একটি বিতর্কিত রাজনৈতিক ঘটনা কীভাবে কভার করা হবে, সে সিদ্ধান্তকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়; মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিচার করা তো দূরের কথা। এ ধরনের আচরণ আন্তর্জাতিক অপরাধ হতে পারে—এমন ধারণা আইনগতভাবে ভুল। আইনি ভিত্তি ছাড়া বিচারপ্রক্রিয়া শুরুর সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সাংবাদিক ও গণমাধ্যমগুলোর ওপর ভীতিকর প্রভাব (চিলিং ইফেক্ট) সৃষ্টি করে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়: রূপা ও বাবু, সেই সঙ্গে রূপার স্বামী ও একাত্তর টিভির সহকর্মী সাংবাদিক শাকিল আহমেদ এবং দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত ২০২৪ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর থেকে বিচারপূর্ব আটকাবস্থায় রয়েছেন। শেখ হাসিনার সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটানো ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা অসংখ্য হত্যা মামলায় তারা আটক আছেন। এসব মামলার কোনোটিতেই এখন পর্যন্ত অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়নি, এবং অভ্যুত্থান নিয়ে সাংবাদিকদের প্রতিবেদনকে কীভাবে হত্যার অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়, তার কোনো ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি। সাবেক সরকারের সমর্থক হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হাজার হাজার হত্যা মামলার মধ্যে এগুলো অন্যতম, যার অনেকগুলোর পেছনে কোনো জ্ঞাত সাক্ষ্যপ্রমাণ নেই।

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৬ সালের ১১ মে বাংলাদেশের হাইকোর্ট রূপা ও আহমেদকে তাদের বিরুদ্ধে থাকা অধিকাংশ মামলায় জামিন দেন, তবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পরবর্তীতে সেই আদেশ স্থগিত করেন। সংস্থাগুলোর ভাষায়, আইসিটির এই প্রক্রিয়া এখন একটি পৃথক পথ তৈরি করেছে— এমন একটি আদালত ব্যবস্থায়, যেখানে জামিন খুব কমই মঞ্জুর হয়। ফলে হত্যা মামলাগুলোতে জামিনের যেকোনো সিদ্ধান্ত নির্বিশেষে রূপা ও বাবুকে অব্যাহত আটকাবস্থায় থাকতে হবে।

বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা মনে করি, রূপা ও বাবুর বিরুদ্ধে আইসিটিতে গৃহীত পদক্ষেপ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির (আইসিসিপিআর) ১৫ ও ১৯ অনুচ্ছেদের অধীনে বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতার পরিপন্থী, যে চুক্তিতে বাংলাদেশ একটি স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রপক্ষ।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বাংলাদেশ সরকারের প্রতি কয়েকটি সুনির্দিষ্ট আহ্বান জানিয়েছে।

প্রথমত, প্রসিকিউশনের তদন্ত যেভাবেই এগোক না কেন, ফারজানা রূপা ও মোজাম্মেল বাবুকে যেন কেবল তাদের সাংবাদিকতার ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক অভিযুক্ত হিসেবে নাম না দেওয়া হয়, তা নিশ্চিত করা; এবং সাংবাদিক সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলো পর্যালোচনা করতে ও কোনো মামলা কেবল বৈধ সাংবাদিকতা কার্যক্রমের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে কি না তা যাচাই করতে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পর্যালোচনা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা।

দ্বিতীয়ত, সাংবাদিক ফারজানা রূপা, শাকিল আহমেদ, মোজাম্মেল বাবু ও শ্যামল দত্তকে সেসব মামলা থেকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া, যেখানে তারা কেবল শান্তিপূর্ণভাবে মানবাধিকার চর্চা ও সংবাদ পরিবেশনার কারণে আটক রয়েছেন; তাদের সাংবাদিকতা পেশার জন্য দায়ের করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করা; এবং বাংলাদেশজুড়ে সাংবাদিকসহ অন্যান্য মানুষের বিরুদ্ধে মামলা-স্তূপীকরণ (কেস-স্ট্যাকিং) ও গণহারে প্রাথমিক তথ্য বিবরণী (এফআইআর) দায়েরের চর্চা বন্ধ করা।

সেই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাসহ দেশের প্রতিটি মানুষের মানবাধিকার নিশ্চিত ও সমুন্নত রাখার আহ্বানও জানিয়েছে সংস্থাগুলো।

বিবৃতিতে বলা হয়, এসব পদক্ষেপ গ্রহণ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনী ইশতেহারে সাংবাদিক নিপীড়ন বন্ধের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। সংস্থাগুলো বলেছে, আমরা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই, উল্লিখিত মামলাগুলো দিয়ে শুরু করে সেই প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপান্তরিত করতে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ