Views Bangladesh Logo

পাসের হার কমা মানেই কি শিক্ষার মান কমে যাওয়া?

Raju Norul

রাজু নুরুল

রেকর্ড ৮২ দিন পর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। সকল বোর্ড মিলিয়ে এবার পাসের হার ৬২%। প্রায় ১৮ লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখের কিছু বেশি। এসএসসি পরীক্ষার ফল বিবেচনায়, গত বিশ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন পাসের হার। ২০২১ সালের তুলনায় এ হার ৩১% কম। গত বছরের চেয়ে অন্তত ৬ ভাগ কম শিক্ষার্থী এ বছর পাস করতে পেরেছে।

গণমাধ্যমের খবরে জানা যাচ্ছে, সারা দেশে অন্তত ৩১২টি প্রতিষ্ঠানে কেউ পাস করেনি। এর মধ্যে মাদ্রাসা আছে ২২৬টি, অর্থাৎ মোট অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠানের ৮৫ ভাগ মাদ্রাসা। জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও আগের বছরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। তবে আশার দিক হলো, যথারীতি মেয়েরা তাদের ভালো ফলাফল অব্যাহত রেখেছে। ছেলেদের চেয়ে অন্তত ১১ হাজারের বেশি মেয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে। যেসব শিক্ষার্থী জীবনের প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরীক্ষা উতরে গেছে, তাদের সবাইকে অভিনন্দন!

এবার পরীক্ষা শেষ হওয়ার রেকর্ড ৮২ দিন পর ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। গত দুই দশকে ৬০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে ফলাফল ঘোষণার যে রীতি চালু হয়েছিল, সেটি এবার ধরে রাখা যায়নি। এবারও সরকারের পক্ষ থেকে একই রকম লক্ষ্য থাকলেও, শিক্ষামন্ত্রী কিছুটা সময় চেয়ে নিয়েছিলেন। সেই সময় চাওয়ার অন্তত ২০ দিন পর ফলাফল প্রকাশিত হলো।

বিলম্বের কারণ হিসেবে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেশজুড়ে বন্যা ও এইচএসসি পরীক্ষা সংক্রান্ত জটিলতাকে দেখানো হয়েছিল। কিন্তু কিছু কিছু গণমাধ্যম তখন জানিয়েছিল যে, ফলাফল প্রকাশের বিলম্বের কারণ মূলত "ফলাফল বিপর্যয়"। প্রাথমিক মূল্যায়নে মোট পাসের হার প্রকাশিত হারের চেয়ে আরও অনেক কম এসেছিল, যা পরবর্তীতে সমন্বয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এই খবর সত্যি হলে এবং প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলাফলকে বিবেচনা করলে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, শতকরা পাসের হারের ভিত্তিতে এটি বিগত বছরগুলোর তুলনায় অত্যন্ত কম। ফলে পাসের হার নিয়ে আলোচনার যেমন প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি এটি "ফলাফল বিপর্যয়" কিনা, সেটিও আলোচনার দাবি রাখে। পাসের হার কমে যাওয়া মানেই কি ফলাফল বিপর্যয়?

বিগত বছরগুলোতে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার অবিশ্বাস্যভাবে বেড়ে গিয়েছিল। কোনো কোনো বছর এ হার শতকরা ৯০ ভাগ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। দেয়ালে কান পাতলে কারণ হিসেবে নানা কথা শোনা যায়। বলা হয়, মন্ত্রণালয় থেকে পাস করিয়ে দেওয়ার নির্দেশ ছিল, এমনকি খাতায় লিখলেই নম্বর দেওয়ার চল শুরু হয়েছিল। ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের কাছ থেকে জেনেছিলাম, শিক্ষার্থীকে পাস করিয়ে না দেওয়ার কারণে কোনো কোনো শিক্ষককে রীতিমতো শাস্তির মুখেও পড়তে হয়েছিল।

শিক্ষায় ভর্তি ও পাসের হার—উভয় ক্ষেত্রেই বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশ অবিশ্বাস্য সাফল্য অর্জন করেছে। এটি উদযাপন করার মতোই। কিন্তু মান উন্নয়ন ও রক্ষার দিক থেকে তা সমালোচনার মুখে পড়েছে। গত দুই বছর ধরে, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শিক্ষাঙ্গনে বিশৃঙ্খলা, শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আচরণ, মব কালচারের চর্চা দেখে খানিকটা অনুমান করা গেছে। এ সময়ে দেশের শিক্ষাঙ্গনের পরিস্থিতি যেকোনো বিবেকবান মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। একই সঙ্গে, শিক্ষার পরবর্তী স্তরে গিয়ে ঝরে পড়ার হার দেখেও শিক্ষার মান অনুমান করা যাচ্ছিল।

ফলে সরকার গঠনের পর বিএনপি সরকারের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ ছিল শিক্ষায় শৃঙ্খলা ফেরানো। নকলের মতো পুরোনো কিছু বিষয়, বা প্রথম শ্রেণিতে পুনরায় ভর্তি পরীক্ষা ফিরিয়ে আনার মতো অপ্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তের পেছনে শিক্ষামন্ত্রীর দৌড়ঝাঁপ সমালোচনার কারণ হয়েছে বটে, কিন্তু গড়পড়তা পাস করিয়ে না দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের কঠোর ভূমিকার প্রশংসা করতে কোনো দ্বিধা নেই।

খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসবে, পাসের হার কমে যাওয়া মানেই কি শিক্ষার মান কমে যাওয়া? উত্তর হলো, না। বরং মানহীন শিক্ষা হলো এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান, বাস্তবমুখী দক্ষতা ও নৈতিক মূল্যবোধ দিতে ব্যর্থ হয়। এতে কেবল সনদ বা ডিগ্রি অর্জন হতে পারে, কিন্তু শিক্ষার্থীর মানসিক ও পেশাগত বিকাশ ঘটে না। এ ক্ষেত্রে অন্যতম বড় ভূমিকা পালন করেন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকবৃন্দ।

দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের সবচেয়ে মূল্যবান অলংকার। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এসব উপেক্ষা করে আমরা পাসের হারকে শিক্ষার মানের প্রমাণ হিসেবে জনসমক্ষে হাজির করেছি। পরিবারগুলোর কাছেও জিপিএ-৫ বা গোল্ডেন জিপিএ পাওয়া সামাজিক সম্মানের সূচক হয়ে উঠেছে। ফলে যথেচ্ছভাবে নম্বর দেওয়া, ৭৮ পেলে ৮০ দিয়ে দেওয়ার মতো অলিখিত বিধান চালু হয়ে গিয়েছিল। এর ফলে কোটি কোটি সার্টিফিকেট অর্জন করা গেছে বটে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

এবার এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করার পরও ৩৮ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী প্রথম দিন কেন্দ্রে আসেনি। এবার এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাত লাখের বেশি অকৃতকার্য শিক্ষার্থী। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, তারা সমাজ থেকে বাতিল, আর কোনো কাজে লাগবে না, বা তাদের জীবন শেষ। বরং ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে, এই ফল থেকেই দেশের শিক্ষার সার্বিক চিত্র—কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীরা দুর্বল, কোন অঞ্চল পিছিয়ে আছে—সবকিছু খুঁজে বের করা সম্ভব।

শিক্ষার মান বৃদ্ধির জন্য সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়াও সম্ভব। খারাপ ফল করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা অঞ্চলে নজরদারি জোরদার করা যেতে পারে। এর সঙ্গে যারা পুনরায় শিক্ষায় ফেরার মতো পরিস্থিতিতে নেই, তাদের জন্য কারিগরি শিক্ষা ও বিভিন্ন পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করতে পারে।

আগামী দিনগুলোতে শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য আরও নানামুখী কর্মসূচি দেখার অপেক্ষায় আছে মানুষ। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে ফিরেছে, মব কালচার থেকে বিরত থাকছে, শিক্ষকরা সম্মানের সঙ্গে পাঠদান করছেন, একটি সুস্থ মূল্যবোধসম্পন্ন জাতি গড়ে উঠছে—এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর কী হতে পারে?

রাজু নূরুল: লেখক, উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ। বেলজিয়ামে ইউরোপীয়ান পলিসি ও জনপ্রশাসন নিয়ে পড়ছেন। ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের অধীনে পূর্ব আফ্রিকা অঞ্চলের কয়েকটি দেশের সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করছেন।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ