ডিজেলের দাম বাড়ায় বোরো চাষ নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক
আমন মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই ডিজেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তে নতুন করে চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়ে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। এতে সেচের পাশাপাশি জমি প্রস্তুত, ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহনের খরচও বাড়বে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে বোরো চাষে, কারণ এই মৌসুমের বড় অংশের সেচ ডিজেলচালিত যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল।
চলতি বছরের এপ্রিলেও ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। তখন ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা করা হয়। এবার আরও ২০ টাকা বাড়ায় পাঁচ মাসের ব্যবধানে ডিজেলের দাম বেড়েছে ৩৫ টাকা। কৃষিতে জ্বালানিটির ব্যবহার মূলত সেচে হলেও জমি তৈরি, চারা রোপণ, ধান কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও পরিবহনের কাজেও ডিজেলচালিত যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। ফলে দাম বাড়ার প্রভাব কৃষিকাজের বিভিন্ন পর্যায়েই পড়বে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশে বছরে ব্যবহৃত ডিজেলের প্রায় ২৪ শতাংশ কৃষিকাজে যায়। আগের দামে কৃষকের ডিজেল বাবদ বছরে প্রায় ১২ হাজার ৬ কোটি টাকা ব্যয় হতো। নতুন দামে সেই ব্যয় বেড়ে প্রায় ১৪ হাজার ৯৪ কোটি টাকা হতে পারে। অর্থাৎ ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে কৃষকের বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে প্রায় ২ হাজার ৮৮ কোটি টাকা।
বোরো মৌসুমে এই বাড়তি খরচের প্রভাব বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নভেম্বরের শেষ দিকে বোরোর বীজতলা তৈরির কাজ শুরু হয়। এরপর জমি প্রস্তুত থেকে ধান ঘরে তোলা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে সেচের প্রয়োজন হয়। দেশে প্রায় ৮০ শতাংশ সেচ ডিজেলনির্ভর। একই সঙ্গে দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে বোরো থেকে। ফলে এই মৌসুমে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে তার প্রভাব কৃষকের আয়-ব্যয়ের পাশাপাশি চালের উৎপাদন ও সরবরাহেও পড়তে পারে।
এদিকে আমন মৌসুমেই সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমের খরচ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। কোথাও কোথাও বৃষ্টির ঘাটতির কারণে সেচের প্রয়োজনও বেড়েছে। এখন আমন কাটার সময় ডিজেলের দাম বাড়ায় ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহনের খরচ নিয়েও নতুন করে হিসাব করতে হচ্ছে তাদের।
কৃষক আমজাদ হোসেন জানান, এবার আমন চাষে আগের তুলনায় বেশি খরচ হয়েছে। সার ও সেচের খরচ বাড়ার পর ডিজেলের দাম বাড়ায় মাড়াইয়ের খরচও বাড়বে। বোরোতে সেচের প্রয়োজন আরও বেশি হওয়ায় ওই মৌসুম নিয়ে তিনি চিন্তিত। সেচ কম লাগে এমন ফসল চাষের কথাও ভাবছেন তিনি।
কৃষক আরাফাত আলী জানান, আমনের তুলনায় বোরোতে সেচের প্রয়োজন বেশি। ডিজেলের দাম বাড়লে সেচের পাশাপাশি মাড়াইয়ের খরচও বাড়বে। এতে অনেক কৃষক বোরো চাষ কমিয়ে দিতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
নওগাঁর কৃষক আবদুল হামিদেরও একই ধরনের উদ্বেগ। তার আশঙ্কা, উৎপাদন খরচ বাড়তে থাকলে কৃষিকাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হবে। কৃষকের খরচ বাড়লেও সেই অনুপাতে ধানের দাম না বাড়লে লোকসান সামলে চাষাবাদ করা সম্ভব হবে না বলে জানান তিনি।
দেশের কৃষিতে ডিজেলের ওপর নির্ভরতার পরিমাণও কম নয়। দেশে ৭৫৪টি গভীর নলকূপ, ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৭টি অগভীর নলকূপ এবং ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪টি লো-লিফট পাম্প রয়েছে। এর বাইরে প্রায় ১৬ লাখ ডিজেলচালিত ছোট সেচযন্ত্র রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশে থাকা প্রায় ১৯ লাখ কৃষিযন্ত্রের প্রায় ৭৫ শতাংশই ডিজেলচালিত।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত ডিজেলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। অর্থাৎ বোরো চাষের প্রস্তুতি ও চাষের সময়েই কৃষকের জ্বালানির প্রয়োজন বাড়বে। সেই সময় তাকে বাড়তি দামে ডিজেল কিনতে হবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কৃষি উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে ডিজেলের সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষকের বাড়তি খরচ সমন্বয়ে প্রণোদনা বা ভর্তুকি প্রয়োজন। উৎপাদন খরচ বাড়লেও কৃষক যদি সেই অনুযায়ী ফসলের দাম না পান, তাহলে উৎপাদন কমে যেতে পারে। এতে খাদ্য সরবরাহে প্রভাব পড়ার পাশাপাশি চাল আমদানির প্রয়োজনও বাড়তে পারে।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, সরকার কৃষকের পাশে রয়েছে। বিনামূল্যে বীজ ও কীটনাশকসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ দেওয়া হচ্ছে। ডিজেলের দাম বাড়ার ফলে কৃষিতে কী ধরনের প্রভাব পড়ে, তা পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মতামত দিন