কূটনীতি ও প্রতিরক্ষায় সমন্বয়ে নতুন প্ল্যাটফর্মের পথে ঢাকা-বেইজিং: ইয়াও ওয়েন
চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক সর্বোচ্চ পর্যায়ে এগিয়ে নেওয়ার যাত্রায় কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা খাতে সমন্বয় সাধনে নতুন ‘প্ল্যাটফর্ম’ গঠনের আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।
বৃহস্পতিবার ঢাকায় চীনা দূতাবাসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “এখন আমরা ‘অভিন্ন ভবিষ্যতের লক্ষ্যে চীন-বাংলাদেশ কমিউনিউটি’। এটা সহযোগিতার নতুন সংজ্ঞায়ন। তার মানে হচ্ছে, সর্বোচ্চ পর্যায়ের সহযোগিতা। সুতরাং এই সর্বোচ্চ পর্যায়ের সহযোগিতার সমর্থনে আমাদের কিছু ব্যবস্থাপনা দরকার।”
রাষ্ট্রদূত জানান, সেই ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে ‘রাজনৈতিক পর্যায় থেকে’ দুটি নতুন প্ল্যাটফর্ম গঠনের কথা এসেছে দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে। এর একটি হলো দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে কৌশলগত সংলাপ; অন্যটি কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা খাত মিলিয়ে ‘টু প্লাস টু’ আলোচনার প্ল্যাটফর্ম অনুসন্ধান।
জাতিসংঘের পরবর্তী অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের আসার প্রসঙ্গ টেনে ইয়াও ওয়েন বলেন, ‘তার মানে হচ্ছে, দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীর কৌশলগত দিক নিয়ে আরও বেশি করে আলাপ করবেন।’
দ্বিতীয় প্ল্যাটফর্মের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘টু প্লাস টু’র মানে হচ্ছে, চীন শুধু রাজনৈতিক আলোচনা ও সংলাপ করবে না, বিস্তৃত প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও আমাদের রয়েছে। সুতরাং এই প্ল্যাটফর্মের কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা খাতকে উভয় দেশ কীভাবে দেখে, সেটার আরও সমন্বয় সাধন হবে। এর মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে আমাদের কৌশলগত যোগাযোগ, পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা বাড়বে।’
কোন পর্যায়ে এবং কীভাবে ‘টু প্লাস টু’ হবে, সে বিষয়ে সামনের দিনগুলোতে আলোচনা চলবে বলে জানান তিনি।
ইয়াও ওয়েন জানান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে চীনের ‘টু প্লাস টু’ ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি দেশের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ে এ ধরনের আলোচনা করে থাকে বেইজিং।
বাংলাদেশের জন্যও এমন প্ল্যাটফর্ম প্রথম নয় উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগে তুরস্কের সঙ্গে মন্ত্রী পর্যায়ে ‘টু প্লাস টু’ করার ঘোষণা এসেছে। সুতরাং চীন প্রথম নয়। আর এই ঘোষণা এসেছে বেইজিং ও ঢাকার উভয়ের পরামর্শে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘চায়না-বাংলাদেশ কমিউনিটি উইথ শেয়ার্ড ফিউচার’ পর্যায়ে উন্নীত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বিবেচনায় এটিই চীনের সর্বোচ্চ স্তর। এক প্রশ্নের জবাবে ইয়াও ওয়েন জানান, সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই সম্পর্ক ২০টির বেশি দেশের সঙ্গে রয়েছে চীনের। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের পর এই তালিকায় যুক্ত হলো বাংলাদেশ।
জে-১০সি যুদ্ধবিমান কেনা প্রসঙ্গে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর ঘিরে বেইজিং থেকে বাংলাদেশের জে-১০সি যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ নিয়ে প্রশ্নে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ইয়াও ওয়েন।
তিনি বলেন, ‘আপনি নিশ্চয় দেখেছেন, যৌথ বিবৃতিতে উভয় দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গভীর করার বিষয়ে একমত হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে আলোচনা, সফর ও প্রশিক্ষণ। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের ক্ষেত্রে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও যোগাযোগ বজায় রাখার ক্ষেত্রেও একমত হয়েছে।’
‘সুতরাং আমি যেভাবে বলেছি, আমাদের সহযোগিতা খুবই সমন্বিত। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা তারই অংশ। কোনো নির্দিষ্ট কেনাকাটার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়ার মতো জায়গায় আমি নেই। সুতরাং, দয়া করে বুঝুন, আমি কোনো মন্তব্য করার মতো অবস্থানে নাই।’
সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় ওঠার ধারাবাহিকতায় প্রতিরক্ষাসহ সব ক্ষেত্রে সহযোগিতা সামনের দিনে আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন রাষ্ট্রদূত।
উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়া বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রথম বিদেশ সফরে গত ২১ জুন মালয়েশিয়া যান তারেক রহমান। পরদিন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তার একান্ত ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। সেদিনই তিনি পৌঁছান চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর তালিয়ানে। সেখানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে অংশগ্রহণ শেষে বুধবার বিকালে বেইজিংয়ে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় প্রধানমন্ত্রীর তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফর।
এই সফরে বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পাশাপাশি দুই নেতার মধ্যে একান্ত বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। সফর শেষে দুই দেশের যৌথ ঘোষণাপত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ ও চীন।
মতামত দিন