সেই মসজিদেই পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছিলেন মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত নজরুল
সৌদি আরবের মক্কার যে মসজিদে ‘অনৈতিক’ কর্মকাণ্ডের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে নজরুল ইসলাম ও সিথি আক্তারের, সেই মসজিদেই পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন নজরুল। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় সিথি আক্তারের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক থাকার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। তবে কী অভিযোগে তাঁকে আটক করা হয়েছিল, সে বিষয়ে পরিবারকে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির মধ্যে নজরুল ইসলামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায়। তাঁর মা রহিমা বেগম জানিয়েছেন, গত রোববারও সৌদি আরবের কারাগার থেকে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছিলেন তাঁর ছেলে। এর তিন দিন পর বুধবার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানতে পারেন তাঁরা।
রহিমা বেগম বলেন, সেখানে যাওয়ার ছয় মাস পরেই তাকে জেলে নেওয়া হয়। জেলে নেওয়ার এক মাস পর আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমার ছেলে। তখন বলছিল, মা, ওরা মনে হয় আমাকে জেলে রেখে তারপর ছেড়ে দেবে। গত রোববারও কথা বললাম। আর বুধবার শুনলাম এই ঘটনা।
পরিবারের আরেক সদস্য জানিয়েছেন, শেষ দিকে নজরুল তাঁদের বলেছিলেন, সিথি আক্তারের সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তবে এ সম্পর্কের সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
নজরুলের মা জানান, তাঁর ছেলে ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে যান। মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করা নজরুল দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার বড়। পরিবারের আর্থিক অনটন দূর করতে বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। সেখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন।
মা জানান, সৌদি আরবে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর পুলিশ তাঁকে আটক করে। একদিন কর্মস্থলে যাওয়ার পর পুলিশের গাড়ি এসে তাঁকে নিয়ে যায় বলে ছেলেকে বলতে শুনেছেন তিনি। তবে কেন তাঁকে আটক করা হয়েছিল, সে বিষয়ে নজরুল পরিবারকে স্পষ্ট করে কিছু জানাননি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, কারাগারে যাওয়ার পর নজরুল প্রায় প্রতি সপ্তাহেই ফোনে তাঁদের সঙ্গে অল্প সময় কথা বলতেন। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তিন দিন আগেও পরিবারের সঙ্গে তাঁর কথা হয়। তবে আসন্ন মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে কোনো আভাস দেননি তিনি।
রহিমা বেগম বলেন, আমরা জানতাম সে জেলে আছে। কিন্তু এমন হবে, ছেলেও কিছু বলেনি। এরপর বুধবার সন্ধ্যায় খবর হওয়ার পরপরই লোকজনের কাছ থেকে জানতে পারি।
ছেলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা এবং ঘটনার ন্যায়বিচার দাবি করেছেন তিনি। তাঁর আকুতি, তিন বছর তিন মাস ছেলের মুখ দেখি না। আমি যেন ছেলের চেহারা শেষবারের মতো দেখতে পারি।
সৌদি আরবের সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক’ কর্মকাণ্ডের অভিযোগে দুই বাংলাদেশিকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তবে সৌদি আরব ও বাংলাদেশ সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের পরিচয় প্রকাশ করেনি।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, সরকার জানতে পেরেছে, ওই দুই বাংলাদেশিকে ২০২৩ সালে আটক করা হয়েছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে মামলার রায়ের কপি চেয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। রায়ের কপি পাওয়ার পর বিস্তারিত জানানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়াকে ডেকে বৈঠক করেছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ রায়হান রশীদ বলেছেন, বিদেশে কোনো নাগরিক গ্রেপ্তার হলে তাঁর নিজ দেশের দূতাবাসের কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। ১৯৬৩ সালের কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদে এ বিষয়ে বিধান রয়েছে। তাঁর মতে, আটক হওয়ার পর থেকেই নজরুলের কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন ছিল।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবুসাঈদ জানিয়েছেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিদের একজন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নজরুল কি না, সে বিষয়ে তাঁরা এখনো সরকারিভাবে কোনো তথ্য পাননি।
মতামত দিন