Views Bangladesh Logo

ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়ার পরও বাংলাদেশে দমন-পীড়ন ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি অব্যাহত: এইচআরডব্লিউ

 VB  Desk

ভিবি ডেস্ক

শেখ হাসিনার সরকার পতন এবং অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের এক বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশে দমন-পীড়ন ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি রয়ে গেছে বলে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। বুধবার (৩০ জুলাই) সংস্থাটি তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এই মন্তব্য করে।

এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের পর উল্লেখযোগ্য সংস্কারের আশা দেখা দিলেও অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় কম। সংস্থাটির এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘যারা শেখ হাসিনার দমনমূলক শাসনের বিরুদ্ধে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিবাদ করেছেন, তারা এখনো অর্থবহ পরিবর্তনের অপেক্ষায়। অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিশোধের রাজনীতিতে আটকে গেছে, যেখানে মানবাধিকারের পরিবর্তে প্রতিহিংসা এজেন্ডা প্রাধান্য পাচ্ছে।’

বিগত সরকারের ১৫ বছরের শাসনে গুম, নির্যাতন ও দমন-পীড়ন ব্যাপকভাবে ঘটেছে। যদিও তা কিছুটা কমেছে বলে উল্লেখ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। তাদের মতে, নতুন করে সমালোচকদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গ্রেপ্তারের ঘটনা বেড়েছে। গত ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমাবেশকে ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনায় পাঁচজন নিহত হন। এর পর হাজার হাজার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়, যাদের অনেকের নাম উল্লেখ করা হয়নি। এরপর শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়, যার মধ্যে বেশ কয়েকজন বিরোধী দলের নেতাও রয়েছেন।

৬ আগস্ট থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৯২ হাজার জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, যাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা উত্তরের সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম, যিনি ৬৮টি হত্যা মামলার আসামি। এর মধ্যে ৩৬টি ঘটনা তার বিদেশে থাকাকালীন ঘটেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে তিনি আটক রয়েছেন। এখনও তার বিচার শুরু হয়নি।

এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, এসব মামলার অনেকগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আগের সরকারের সময় যেসব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ২০২৪ সালের সহিংসতার ঘটনায় পুলিশ জানিয়েছে, মাত্র ৬০ জন কর্মকর্তাকে আটক করা হয়েছে, যদিও র‌্যাব, পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর বিস্তৃত ভূমিকার অভিযোগ রয়েছে।

ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই ইউনূস প্রশাসন একটি গুম তদন্ত কমিশন গঠন করে এবং আন্তর্জাতিক ‘অপহরণবিরোধী চুক্তিতে’ স্বাক্ষর করে। কমিশনে এখন পর্যন্ত ১,৮০০’র বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে এবং দুটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে যে, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা প্রমাণ ধ্বংস ও তদন্তে বাধা দিচ্ছে, কেউ কেউ আবার দেশ ছেড়ে পালিয়েছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, নারী অধিকার থেকে পুলিশ সংস্কার পর্যন্ত ১১টি কমিশনের সুপারিশ সরকারের হাতে থাকলেও বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি নেই। রাজনৈতিক সংলাপ থমকে আছে এবং জাতিসংঘের ১৩২৫ নম্বর প্রস্তাবনার বাস্তবায়ন খুবই সীমিত।

এদিকে বিশেষ ক্ষমতা আইনে এখনো শত শত ব্যক্তি আটক রয়েছেন। ফেব্রুয়ারিতে চালানো “অপারেশন ডেভিল হান্ট” অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া ৮ হাজার ৬০০ জনের মধ্যে অনেকের পরিবার দাবি করছেন, তারা আওয়ামী লীগের সমর্থক। শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে আগামী ৩ আগস্ট থেকে তার বিরুদ্ধে প্রথম মামলার বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এই মামলায় তিনজন অভিযুক্ত রয়েছেন, কিন্তু অন্যান্য মামলার তদন্ত স্থবির। এ ছাড়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই আটক রয়েছেন অনেকে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, বেআইনিভাবে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি এবং র‌্যাবসহ নিরাপত্তা খাতে সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ। সংস্থাটি কানাডা, যুক্তরাজ্য ও সুইডেনের আদলে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং যেসব অভিযুক্ত ব্যক্তি বিদেশে পালিয়ে গেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘মানুষ যেসব পরিবর্তনের জন্য জীবন দিয়েছে, এখন তা বাস্তবায়নই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘যারা এক সময় দমন-পীড়নের শিকার ছিলেন, এখন তাদেরই দায়িত্ব এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করার, যেখানে সবার অধিকার রক্ষা পায় এবং অতীতের অন্যায় পুনরাবৃত্তি না ঘটে।’

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ