সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি ও এসআইকে আদালতে তলব
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে পরপর তিনটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় দায়ের করা বিস্ফোরক মামলায় আওয়ামী লীগের তিন নেতাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও তাদের আদালতে সোপর্দের ক্ষেত্রে পুলিশের নথিতে নানা ত্রুটি ও অসঙ্গতি সামনে এসেছে। আসামিদের বয়স, শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসা নথি এবং গ্রেপ্তারের কারণ ও সময় নিয়ে অসঙ্গতি পাওয়ায় সুন্দরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিন মোহাম্মদ আমানুল্লাহ ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মিজানুর রহমানকে সশরীরে আদালতে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
গত বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) গাইবান্ধার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালতের (সুন্দরগঞ্জ)বিচারক পাঁপড়ি বড়ুয়া এ আদেশ দেন। তবে আদেশের বিষয়টি রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাতে জানাজানি হয়।
মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন আওয়ামী লীগ নেতা আনিছুর রহমান (৫২), সুলতান আহম্মেদ (৬৫) ও লিটন মণ্ডল (৩৯)।
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা গেছে, গত ২০ সেপ্টেম্বর ভোরে সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড ও দহবন্দ ইউনিয়নের গোপালচরণ এলাকায় পরপর তিনটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। ভোর ৪টা ২৬ মিনিটে উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আবু সোলাইমান সরকার সাজার বাড়ির সামনে প্রথম বিস্ফোরণটি হয়। এর ঠিক দুই মিনিট পর গোপালচরণ উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে এবং ভোর ৪টা ৩০ মিনিটে ওই বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশের সড়কে তৃতীয় বিস্ফোরণটি ঘটে। কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও পরপর ককটেল বিস্ফোরণে এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা সে সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান শুনতে পান বলে জানান। এ ঘটনার পর সুন্দরগঞ্জ থানার এসআই মো. নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ২৫ থেকে ৩০ জনকে আসামি করে বিস্ফোরক দ্রব্য ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করেন।
মামলাটির তদন্তে পুলিশ প্রথমে শান্তিরাম ইউনিয়ন শাখা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনিছুর রহমানকে (৫২) গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে গত ২৩ সেপ্টেম্বর বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের বাসিন্দা সুলতান আহম্মেদ (৬৫) ও লিটন মণ্ডলকে (৩৯) গ্রেপ্তার করা হয়। আসামিদের আদালতে পাঠানোর পর তাদের বয়স ও শারীরিক অবস্থানসহ নানা বিষয়ে প্রশ্নের মুখ পড়তে হয় পুলিশকে।
আসামি সুলতান আহম্মেদ দাবি করেন, পুলিশের নথিতে ৬৫ বছর বলা হলেও বাস্তবে তার বয়স ৭২ বছরের বেশি এবং তিনি লিভারের সমস্যা ও ডায়াবেটিসে ভুগছেন। অন্যদিকে লিটন মণ্ডলের দাবি, তাকে দুপুর সাড়ে ১২টায় গ্রেপ্তার করা হলেও পুলিশের চালান পত্রে সময় বেলা সাড়ে ৩টা উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, আসামি লিটন মণ্ডল দাবি করেন, তাকে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গ্রেপ্তার করা হলেও পুলিশের চালান পত্রে গ্রেপ্তারের সময় বেলা সাড়ে ৩টা উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তাদের এমন অসঙ্গতির ব্যাপারে আদালতের আদেশে বলা হয়, আসামিদের বয়স, গ্রেপ্তারের কারণ ও সময় এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। একইসঙ্গে তদন্তকারী কর্মকর্তার নাম, পদবি, সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ত্রুটি রয়েছে। এসব বিষয় যথাযথভাবে যাচাই না করে কেন আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা জানতে সুন্দরগঞ্জ থানার ওসিকে স্বশরীরে আদালতে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মিজানুর রহমান দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করেছেন কি না, তা জানতে তাকেও আদালতে উপস্থিত হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুই কার্যদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। শুনানি শেষে আদালত আসামিদের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
আদালতের আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করে সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি শাহিন মোহাম্মদ আমানুল্লাহ বলেন, দুই কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়ার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মিজানুর রহমান আদালতে স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে লিখিত জবাব দিয়েছেন। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে তাদের গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক মামলা কিংবা অন্য কোনও অপরাধের মামলায় প্রবীণ ও শারীরিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানোর নজির রয়েছে। এ মামলায়ও তদন্তের ভিত্তিতে আসামিদের গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। তবে আসামিদের বয়স, শারীরিক অবস্থা ও গ্রেফতারের বিষয়টি নিয়ে আদালত ব্যাখ্যা চেয়েছেন। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লিখিত জবাব দাখিল করবেন।
অন্যদিকে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মিজানুর রহমান বলেন, তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহভাজন হিসেবে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালতের আদেশ পাওয়ার পর তিনি আদালতে উপস্থিত হয়ে লিখিত জবাব দিয়েছেন। মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
মতামত দিন