Views Bangladesh Logo

গ্রামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং, বাড়ছে ‘জনরোষ’

গ্যাসের সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশজুড়ে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন মানুষ। কোনো কোনো এলাকায় দিনে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এতে বাসাবাড়ির পাশাপাশি ব্যবসা, কৃষি, মৎস্য ও পোলট্রি খাতে বড় ধরনের ভোগান্তি তৈরি হয়েছে।

দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় তীব্র গরমে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ দুর্ভোগে পড়ছেন। ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা। অন্যদিকে বিদ্যুৎ নিয়ে মানুষের অসন্তোষ বাড়তে থাকায় কয়েকটি জেলার বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা নিজেদের কার্যালয় ও উপকেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তা চেয়েছে।

জাতীয় গ্রিডের বুধবার (১২ আগস্ট) সকালের তথ্য অনুযায়ী, সকাল ৮টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২৪৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১২ হাজার ৯৩৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৩১৪ মেগাওয়াট।

এর আগে ভোর ৪টায় চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৯৬৯ মেগাওয়াট এবং সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ১৮ মেগাওয়াট। তখন ঘাটতি দাঁড়ায় ২ হাজার ৯৫১ মেগাওয়াট। রাত ১টায় জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের ঘাটতি সর্বোচ্চ ৩ হাজার ১৯৪ মেগাওয়াটে পৌঁছায়।

শহরের চেয়ে গ্রামেই ভোগান্তি বেশি

বড় শহরগুলোর তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব বেশি পড়ছে। গত মঙ্গলবারের তথ্য অনুযায়ী, চাহিদার তুলনায় ময়মনসিংহে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি ছিল। সেখানে প্রয়োজনীয় সরবরাহের তুলনায় ৩০ দশমিক ৫৭ শতাংশ বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা যায়।

গোপালগঞ্জ পৌর এলাকায় প্রতিদিন আট থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে জানিয়েছে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো)। এতে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ায় অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য নাশকতার আশঙ্কায় নিজেদের কার্যালয় ও উপকেন্দ্রের আশপাশে নিয়মিত পুলিশি টহল চেয়েছে সংস্থাটি।

রাজশাহী শহরে প্রতিদিন দুই থেকে চার ঘণ্টা লোডশেডিং হলেও গ্রামীণ এলাকায় ছয় থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। জেলার পাঁচটি উপজেলায় বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা ১১০ থেকে ১১৫ মেগাওয়াট। সেখানে সরবরাহ মিলছে মাত্র ৮০ থেকে ৮৫ মেগাওয়াট। ফলে প্রায় ২৫ শতাংশ ঘাটতি থাকছে।

জনঅসন্তোষের আশঙ্কায় রাজশাহী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জেলার ১৪টি উপকেন্দ্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা চেয়েছে।

নেত্রকোনার বিভিন্ন এলাকায় দিন-রাত মিলিয়ে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগ করেছেন গ্রাহকেরা। নীলফামারীর ডোমারেও অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হওয়ায় স্থানীয় বিদ্যুৎ কার্যালয় পুলিশের সহায়তা চেয়েছে।

গরমে অতিষ্ঠ হয়ে সড়ক অবরোধ

সিলেটেও বিদ্যুতের ঘন ঘন আসা-যাওয়ায় দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। গ্রামাঞ্চলের কোনো কোনো এলাকায় দিনের প্রায় অর্ধেক সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। শহরেও প্রায় প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার প্রতিবাদে মঙ্গলবার রাতে সিলেট সদর উপজেলার টুকের বাজারে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক অবরোধ করেন ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা।

সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় বিকেলে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ২৪৭ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ ছিল ২০২ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ঘাটতি ছিল ৪৫ মেগাওয়াট।

সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী ইমাম হোসেন বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে যতটুকু বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, ততটুকুই বিতরণ করা হচ্ছে। সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিং চলবে। জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ বাড়লে লোডশেডিংও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

বিপাকে কৃষি, মাছ ও পোলট্রি খাত

বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে উৎপাদন খাতেও। সেচে সমস্যা হওয়ায় কৃষকেরা সময়মতো জমিতে পানি দিতে পারছেন না। হিমাগারে কৃষিপণ্য সংরক্ষণেও বেড়েছে ডিজেলনির্ভর জেনারেটরের ব্যবহার।

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে রাতে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় মানুষের স্বাভাবিক ঘুম ব্যাহত হচ্ছে। অল্প সময়ের জন্য বিদ্যুৎ আসার পর আবার চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

ইলিশ ধরার মৌসুমে বিদ্যুৎ সংকটে বরফ উৎপাদনও ব্যাহত হয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বরফ কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এতে বরফের দাম বেড়ে যাওয়ায় জেলেদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

খুলনায় বিদ্যুৎ না থাকায় চিংড়ি চাষিরাও বিপাকে পড়েছেন। অক্সিজেন সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় এয়ারেটর চালাতে না পারায় চিংড়ি ঘের ক্ষতির মুখে পড়ছে।

যশোরসহ বিভিন্ন এলাকার পোলট্রি খামারেও তীব্র গরমের সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভ্রাট যুক্ত হয়ে পাখি মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালাতে গিয়ে বাড়ছে জ্বালানি খরচ, ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।

বিদ্যুৎ স্থাপনায় নিরাপত্তা চাওয়া হচ্ছে

বিদ্যুৎ সংকট যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে বিতরণকেন্দ্র ও বিদ্যুৎ কার্যালয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। গ্রাহকদের অসন্তোষ থেকে হামলা, ভাঙচুর কিংবা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির আশঙ্কায় কয়েকটি বিতরণ সংস্থা পুলিশি নিরাপত্তা চেয়েছে।

গোপালগঞ্জে ওজোপাডিকোর বিভাগীয় কার্যালয় তাদের পাওয়ারহাউস এবং দুটি ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্রের আশপাশে পুলিশি টহল চেয়েছে। রাজশাহী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ১৪টি উপকেন্দ্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তার অনুরোধ জানিয়েছে। একই ধরনের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে নেত্রকোনা ও নীলফামারীর বিদ্যুৎ কর্মকর্তারাও।

এদিকে বিদ্যুৎ সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে গ্যাসের ঘাটতিকে দায়ী করা হচ্ছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমে গিয়ে লোডশেডিং বাড়ছে।

সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ সংকট এখন আর শুধু ঘরে ঘরে অন্ধকারের সমস্যা নয়। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, মৎস্য, পোলট্রি, ব্যবসা ও দৈনন্দিন অর্থনীতিতে। একই সঙ্গে দীর্ঘ লোডশেডিংকে কেন্দ্র করে জনঅসন্তোষ বাড়ায় বিদ্যুৎ স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দ্রুত উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এই সংকটের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ