Views Bangladesh Logo

কনস্যুলেট ছেলের খোঁজ নেয়নি, অন্য কারও যেন এমন পরিণতি না হয়: সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত নজরুলের বাবা

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি যুবক নজরুল ইসলামের পরিবারের অভিযোগ, কারাগারে থাকার সময় তাঁর সঙ্গে বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কেউ যোগাযোগ করেননি। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগেও পরিবারকে কিছু জানানো হয়নি। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর তাঁরা বিষয়টি জানতে পারেন। এখন ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি সৌদি আরবে আটক অন্য বাংলাদেশিদের খোঁজখবর রাখার দাবি জানিয়েছেন নজরুলের বাবা আবদুল বাছির।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের বাসিন্দা নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় গত ১৪ অক্টোবর। পরিবারের অভিযোগ, তাঁর আটক, বিচারপ্রক্রিয়া কিংবা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে তাঁদের বা বাংলাদেশ কনস্যুলেটকে আগে থেকে জানানো হয়নি।

ছেলের মৃত্যুর খবরে শোকে ভেঙে পড়েছেন আবদুল বাছির ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। স্বজন ও প্রতিবেশীরা তাঁদের সান্ত্বনা দিতে বাড়িতে ভিড় করছেন। অন্যদিকে ছেলের মৃত্যুর খবর সইতে না পেরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন নজরুলের ফুফু আবেদা বেগম (৬৫)।

আবদুল বাছির বলেন, ‘কারাগারে থাকার সময় ছেলেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বাংলাদেশ কনস্যুলেট থেকে কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে কি না। সে জানিয়েছে, কেউ যোগাযোগ করেনি। প্রতিটি দেশের কনস্যুলেট কারাগারে থাকা নাগরিকদের খোঁজ নেয়। অথচ আমাদের দেশের কনস্যুলেট তার কোনো খোঁজ নেয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলেকে যে অভিযোগে আটক করা হয়েছিল, সে বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আইনজীবী পেয়েছিল কি না, কনস্যুলেটের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ হয়েছিল কি না, তাও বড় প্রশ্ন। আমার ছেলের মতো আর কারও যেন এমন পরিণতি না হয়।’

পরিবারের সদস্যরা জানান, চার ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় নজরুল এসএসসি পাসের পর পরিবারের দায়িত্ব নিতে ২০২২ সালের নভেম্বরে সৌদি আরবে যান। সেখানে মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। তবে সাত-আট মাস পর থেকে পরিবারের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না।

পরে কারাগার থেকে ফোন করে নজরুল জানান, তিনি বন্দি। কিন্তু কী অভিযোগে তাঁকে আটক করা হয়েছে, তা পরিবারকে জানাননি। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় তিন বছর তিন মাস কারাগারে থাকার পর গত ১৪ অক্টোবর তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

নজরুলের বাবা আবদুল বাছির বলেন, ‘ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠাতে ২০২২ সালে সাত লাখ টাকা ঋণ করেছিলাম। যাওয়ার এক মাস পরই সে মক্কায় কাজ পায়। কিন্তু সাত-আট মাস পর থেকে তার খোঁজ পাচ্ছিলাম না। আটকের প্রায় দেড় মাস পর কারাগার থেকে ফোন করে সে বন্দি থাকার কথা জানায়। কী কারণে তাকে আটক করা হয়েছে, তা সে বলেনি, আমরাও জানি না।’

তিনি বলেন, ‘গত রোববার ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হয়। সে জানিয়েছিল, সমস্যার মধ্যে আছে। এরপর বুধবার শুনলাম, তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে আমার বোনও মারা গেছে। ছেলে গেল, বোনও গেল—সব হারিয়ে আমি এখন নিঃস্ব। ঋণের বোঝাও রয়ে গেছে। সরকারের কাছে দাবি, আমার ছেলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক।’

নজরুলের পরিবার জানতে চায়, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তিনি আইনজীবীর সহায়তা পেয়েছিলেন কি না এবং বাংলাদেশ কনস্যুলেট তাঁর বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছিল কি না। একই সঙ্গে সৌদি আরবে আটক অন্য বাংলাদেশিদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে পরিবারটি।

এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ জানান, নজরুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। মরদেহ দেশে ফিরলে ভুক্তভোগী পরিবারকে সহায়তা করা হবে।

সৌদি আরবের মক্কায় একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’ করার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড গত ১৪ অক্টোবর কার্যকর করার কথা জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। সৌদিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আজেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দুই বাংলাদেশি হলেন নজরুল ইসলাম আবদুল বাছির এবং সিথি আক্তার।

তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর বিষয়টি বাংলাদেশের নজরে আসে। এরপর দুই বাংলাদেশির পরিচয়, তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি পাঠায়।

সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্যে তাঁদের নাম ছাড়া পরিচয় শনাক্ত করার মতো বিস্তারিত তথ্য ছিল না। পাসপোর্ট, আকামা ও নাগরিকত্বের তথ্যও পাওয়া যায়নি। দুই বাংলাদেশির পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছিল কি না, তাঁরা আপিলের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না কিংবা কনস্যুলার সহায়তা চেয়েছিলেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা সনদের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদেশে কোনো নাগরিক গ্রেপ্তার হলে তাঁর অনুরোধে আটককারী দেশকে সংশ্লিষ্ট দেশের কনস্যুলেটকে অবিলম্বে জানাতে হয় এবং কনস্যুলার সহায়তার সুযোগ দিতে হয়। তবে নজরুল বা অন্য বাংলাদেশি নাগরিকের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তা জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ