ঢাকায় নির্যাতনের শিকার ১১ বছরের শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক, প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসা
ঢাকার একটি বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতে গিয়ে দীর্ঘদিন নির্যাতনের শিকার হওয়া খাগড়াছড়ির ১১ বছরের শিশুটির শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক। শরীরের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুটিকে জরুরি ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। এ ঘটনায় অভিযুক্ত এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গত শুক্রবার দিবাগত রাত প্রায় তিনটার দিকে শিশুটিকে খাগড়াছড়ির আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে শয্যা না থাকায় এত দিন মেঝেতে তার চিকিৎসা চলছিল। বৃহস্পতিবার একটি কেবিন খালি হলে তাকে সেখানে স্থানান্তর করা হয়।
হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, শিশুটির সঙ্গে রয়েছেন তার ষাটোর্ধ্ব দাদি। শিশুটির বাবা আইনি ব্যবস্থা নিতে ঢাকায় গেছেন। কেবিনে শুয়ে থাকা নাতনির দিকে তাকিয়ে বারবার কেঁদে উঠছিলেন দাদি।
তিনি বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। কাজ করে পেট ভরে খাবার পাবে, এই আশায় মা-মরা নাতনিকে মানুষের বাসায় কাজে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু তারা নাতনিটাকে আধমরা করে পাঠিয়েছে। ডাক্তার বলেছে আরও ভালো চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে নিয়ে যেতে। আমাদের খাওয়ার টাকাই নেই। কীভাবে চট্টগ্রামে নিয়ে যাব।’
খাগড়াছড়ি জেলা আধুনিক হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা রিপল বাপ্পী চাকমা বলেন, শিশুটির শরীরে দীর্ঘ সময় ধরে নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে। দীর্ঘদিন অভুক্ত থাকা এবং নির্যাতনের কারণে তার শরীর অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার শারীরিক অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। তাকে বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। হাসপাতালের চিকিৎসকেরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, শিশুটিকে নির্যাতনের অভিযোগে ঢাকার দম্পতি মোর্শেদা আক্তার (৩৮) ও তার স্বামী সাইফুদ্দিন রাসেলকে (৪৮) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাকার কলাবাগানের গ্রিন রোডের একটি বাসায় আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, শিশুটির বাবা বাদী হয়ে বুধবার দুপুরে অভিযুক্ত দম্পতির বিরুদ্ধে শিশু নির্যাতন আইনে মামলা করেছেন।
শিশুটির বাড়ি খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলায়। তার বাবা দিনমজুর এবং মা মারা গেছেন। সংসারে অভাবের কারণে প্রায় দেড় বছর আগে মেয়েকে গৃহকর্মীর কাজে ঢাকায় পাঠান বাবা। তখন শিশুটি মাদ্রাসার চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী ছিল।
শিশুটির বাবা জানান, মেয়েকে কোথায় নেওয়া হচ্ছে বা কার বাসায় রাখা হবে, তা তিনি জানতেন না। প্রতিবেশী তোফাজ্জল হোসেনের মাধ্যমে মেয়েকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল। তোফাজ্জল তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন, মেয়েটি ভালো থাকবে এবং কাজের পাশাপাশি পড়াশোনার সুযোগও পাবে।
শিশুটির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে তাকে ফেনী শহরের ট্রাংক রোড বড় মসজিদের কাছে একটি বাসায় এক নারীর কাছে রাখা হয়। পরে ওই নারী তাকে ঢাকায় তার বোনের বাসায় পাঠান। ঢাকার মিরপুরের কাফরুল থানার পূর্ব শেওড়াপাড়ার ওই বাসায় গৃহকর্তা ছিলেন রাসেল এবং গৃহকর্ত্রী মোর্শেদা আক্তার, যিনি ছোটন নামে পরিচিত।
শিশুটির অভিযোগ, ওই বাসায় যাওয়ার পর থেকেই তার ওপর নির্যাতন শুরু হয়। সামান্য ভুল হলেই তাকে মারধর করা হতো। শরীরের বিভিন্ন স্থানে গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো। গৃহকর্ত্রী ও তার মেয়ে তাকে মারধর করত। দিনের বেশির ভাগ সময় তাকে টয়লেটে আটকে রাখা হতো এবং ঠিকমতো খাবারও দেওয়া হতো না। এক বছরের বেশি সময় ধরে প্রায় প্রতিদিনই তাকে এভাবে নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ শিশুটির। এই সময়ে বাবার সঙ্গে একবারও কথা বলতে দেওয়া হয়নি তাকে।
মেয়েকে ঢাকায় পাঠানোর পর এসব নির্যাতনের কথা জানতে পারেননি তার বাবা। কয়েক দিন আগে শিশুটির মাথা ও থুতনিতে গুরুতর আঘাত করা হয় বলে অভিযোগ। পরে তাকে ঢাকা থেকে ফেনী সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। খবর পেয়ে তার বাবা ফেনীতে যান। সেখান থেকে গত শুক্রবার দিবাগত রাতে মেয়েকে নিয়ে খাগড়াছড়ির আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালে পৌঁছান তিনি।
এখন শিশুটির শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঠেকাতে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। তবে পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় সেই চিকিৎসার ব্যবস্থা করা নিয়েই দুশ্চিন্তায় স্বজনেরা।
মতামত দিন