Views Bangladesh Logo

সাদাকালো টিভির দিনগুলোতে রঙিন ঈদ আয়োজন

আমাদের ছেলেবেলার জীবনটা ছিল সত্যিই সাদামাটা কিন্তু আনন্দময়। এ সময়ের মতো এত এত বিনোদন মাধ্যম তখন ছিল না। শুধু ছিল বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)। টেলিভিশন সেটগুলো ছিল সাদাকালো, পর্দা ছিল ১৪ ইঞ্চি, ১৭ ইঞ্চি ও ২০ ইঞ্চির। এর চেয়ে বড় টিভি সেট কারও ঘরেই দেখিনি সে সময়। কিন্তু আমাদের দেখা টিভি অনুষ্ঠানগুলো সাদাকালোয় দেখলেও আনন্দগুলো ছিল বেশ রঙিন। যে যুগের টিভির ঈদযাপনের কথা লিখছি, সে সময় ছিল না রঙিন টিভি, ভিসিআর, এইচডি টিভি, কম্পিউজার, ডিভিডি কিংবা ইউটিউব। ছিল একমাত্র সবেধন নীলমণি বিটিভি। বেশির ভাগ গ্রামে তখনও ইলেকট্রিসিটি আসেনি। কিন্তু আমাদের সময় চট্টগ্রামের রাউজান গ্রামে ছিল ইলেকট্রিসিটি। আমরা টিভি দেখা শুরু করি ১৯৮০ সাল থেকে যতদূর মনে পড়ে। সম্ভবত বিকেল বেলা বিটিভি সম্প্রচার শুরু হতো আর শেষ হতো রাত ১২টায়। শুরু হতো জাতীয় সংগীত দিয়ে, শেষও হতো জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীত বাজিয়ে।

তখন বাংলাদেশে কোনো প্রাইভেট টিভি চ্যানেল ছিল না। টিভি বলতে বাঙালির ছিল একমাত্র ওয়ান অ্যান্ড ওনলি বিটিভি। নব্বইয়ের দশকের শেষ ভাগের আগ পর্যন্ত দেশে টেলিভিশন চ্যানেল বলতে ছিল বিটিভিই। তাই আমাদের উৎসব থেকে অবসর— সব কিছুই ছিল বিটিভি কেন্দ্রিক।

আমাদের বাড়িতে একটি ন্যাশনাল প্যানাসনিক সাদাকালো ২০ ইঞ্চি টিভি ছিল। সেই টিভিটাকে ঘিরে আমাদের উঠানে একটা বড়সড় জমায়েত হয়ে যেত প্রতি শুক্রবারে। উঠানে বসিয়ে টিভি সেটকে চালানো হতো। গ্রামের প্রতিবেশীরা যাতে একত্রে বসে বিনোদন নিতে পারেন, সে জন্যই উঠানে বসানো হতো কাঠের বাক্সসহ টেলিভিশন সেটটিকে। আর ঈদের সময় তো আনন্দের হাট জমে যেত।

গণমাধ্যম ও নাটকের সঙ্গে যুক্ত অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৭০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ঈদের বিনোদননির্ভর বা যাকে বলা চলে হাসির নাটক, সে রকম নাটক লেখা শুরু করেন চলচ্চিত্র নির্মাতা আমজাদ হোসেন। ১৯৭৫ থেকে ৭৬ সালের দিকে এক ঈদের নাটকের জন্য তিনি জব্বর আলী নামে একটি চরিত্র তৈরি করেন, যা পরবর্তীতে ঈদের সময় নানা মাত্রিক গল্পে টেলিভিশনের পর্দায় উঠে আসে। আশির দশকের শুরু পর্যন্ত জব্বর আলী প্রবল জনপ্রিয়তা পায়। কিন্তু একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তির কারণে এটির জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ে।

ঠিক ওই সময়েই আবির্ভাব ঘটে হুমায়ূন আহমেদের। বিটিভির সাদাকালো আমলে বাঙালির একজন হুমায়ূন আহমেদ ছিল। সেই হুমায়ূন আহমেদকে ঘিরে মধ্যবিত্ত বাঙালি খুব সুখী ছিল। বাঙালি মধ্যবিত্তের আনন্দ-বেদনার অপরূপ রূপকার ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত বাঙালির ঈদ উৎসব হুমায়ূন আহমেদকে ছাড়া আনন্দময় হতো না, পরিপূর্ণতা পেত না। মধ্যবিত্ত বাঙালির ঈদ উৎসবে পোলাও-কোর্মা, ফিন্নি-সেমাই এবং নতুন জামা-কাপড়ের সঙ্গে হুমায়ূনের ঈদের নাটকও ছিল একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। ঈদের সারা দিনের নানান সামাজিক পারিবারিক আমন্ত্রণ নিমন্ত্রণ, সৌজন্য সাক্ষাৎ, ভোজের আয়োজন এবং অতিথি আপ্যায়নের বিচিত্র ঝক্কিঝামেলার পর সন্ধ্যায় টিভি সেটের সামনে আয়েস করে বসে বাঙালি অপেক্ষা করত হুমায়ূনের নাটকের। সন্ধ্যার পর রাস্তায় লোক চলাচল কমে যেত। একজন হুমায়ূন আহমেদের একটি টিভি নাটক দেখার জন্য বাঙালির সম্মিলিত অপেক্ষার সেই চিত্রটি ছিল অকল্পনীয়। শুধু রাজধানী ঢাকার চিত্র ছিল না এটা। পুরো বাংলাদেশেরই ছিল একই অবস্থা। হুমায়ূন আহমেদের ঈদের নাটকটি ছিল মধ্যবিত্ত বাঙালির অন্যতম প্রধান বিনোদনমাধ্যম। ফাঁকা রাস্তা। হুমায়ূনের নাটক চলছে বিটিভিতে। বিভিন্ন বাড়ির খোলা জানালা দিয়ে পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত আনন্দময় হাস্যধ্বনি শোনা যেত। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে বছরের পর বছর।

ঈদের বিশেষ নাটক ছাড়াও হুমায়ূনের কোনো সাপ্তাহিক কিংবা ধারাবাহিক নাটক প্রচারের রাতেও একই পরিস্থিতি। শুধু হাসির নাটক নয়, হুমায়ূনের দুঃখের বা কষ্টের নাটকও বাঙালি মধ্যবিত্তের চিত্তকে হরণ করত অনায়াস দক্ষতায়। বিটিভিতে তাঁর প্রথম ধারাবাহিক নাটক এইসব দিনরাত্রি তো ইতিহাস সৃষ্টিকারী। এই নাটকের ছোট্ট মেয়েটি, টুনি, ক্যান্সারে যার মৃত্যু হচ্ছে, কিন্তু দর্শক সেটা মেনে নিতে পারছে না। ছোট্ট প্রিয় মেয়েটিকে মেরে না ফেলতে দর্শকরা কতভাবেই না অনুরোধ জানালো নাট্যকার হূমায়ূন আহমেদকে। কিন্তু হুমায়ূন জেদি। তিনি টুনিকে মেরেই ফেললেন। ফলে, তাঁর বিরুদ্ধে কোথাও কোথাও মিছিল হলো। ব্যানারে লেখা, ‘টুনির কেন মৃত্যু হলো, হুমায়ূন আহমেদ জবাব চাই।’

বিটিভিতে হুমায়ূন আহমেদের আরেকটি ধারাবাহিক নাটক কোথাও কেউ নেই প্রচারের সময়েও ঘটেছে একই কাণ্ড। এই নাটকে ‘বাকের ভাই’ নামের চরিত্রটির ফাঁসি হয়ে যাচ্ছে। বাকের ভাইয়ের ফাঁসি রুখতেও মিছিল হলো। পত্রিকায় সে খবর ছাপাও হলো। জেদি হুমায়ূন বাকের ভাইকেও বাঁচালেন না। নাটকের প্রয়োজনে বাকেরকে মরতেই হবে। হুমায়ূন তাকে মারলেনই। দর্শকদের দাবিকে গুরুত্ব না দিয়ে নাটক বা গল্পের দাবিকেই মিটিয়েছেন নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশে টিভি নাটকের ইতিহাসে এই রকম ঘটনা আর কোনো লেখক-নাট্যকারের ক্ষেত্রে ঘটেনি।

হুমায়ূনের নাটকের চরিত্রগুলো হয়ে উঠেছিল আমাদের আপনজন। তাদের হাসিতে আমরা হাসতাম, তারা কাঁদলে আমাদের চোখেও পানি আটকে রাখতে পারতাম না। আমাদের সময়ে টিভি সেটের সামনে ভিড় বেড়ে যেত ঈদের সময়টাতে। ঈদে নাটক, সিনেমা ও ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের প্রমোশনাল ট্রেলার দেখাও ছিল আনন্দের। আর বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তি হানিফ সংকেতের গ্রন্থনা, উপস্থাপনা ও পরিচালনায় জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদির জন্য ছিল অধীর অপেক্ষা। অনেকেই বারবার জানতে চাইত ইত্যাদি অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ। কারণ ইত্যাদিতে সমাজের অসঙ্গতিগুলো জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মাধ্যমে স্কিড হিসেবে দেখানো হতো, আর থাকত মজার মজার নাচ, গান ও মানবিক প্রতিবেদন, দর্শকদের অংশগ্রহণ পর্ব, জাদু— আরও কত কী।

ইত্যাদিতে একটি পর্ব থাকে বিদেশিদের নিয়ে। তারা যখন নাটিকায় অদ্ভুত বাংলা উচ্চারণে ডায়লগ বলত, সব দর্শক হাসিতে গড়িয়ে পড়ত। এক কথায় আমাদের সময়ের সবচাইতে টিভির উপভোগ্য জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ছিল ইত্যাদি। যা এখনও বর্ণাঢ্য আয়োজনে নির্মিত ও সম্প্রচারিত হচ্ছে।

টিভি নাটক ও টেলিফিল্ম ছাড়াও আরও কয়েকটি জনপ্রিয় ঈদ অনুষ্ঠানের মধ্যে ছিল বাংলাদেশের ছায়াছবির গান নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান ছায়াছন্দ। এই অনুষ্ঠানে সে সময়ের জনপ্রিয় বাংলা ছায়াছবির গান একটার পর একটা দেখানো হতো। দর্শকরা খুবই আনন্দ পেত এই ছায়াছন্দ দেখে।

বিটিভির ঈদের অনুষ্ঠানমালায় আরেকটি দর্শকনন্দিত অনুষ্ঠান ছিল বাংলা সিনেমা। নায়করাজ রাজ্জাক, শাবানা, কবরী, ববিতা, আলমগীর, খলিলুর রহমান, আনোয়ার হোসেন, গোলাম মুস্তাফা, জাফর ইকবাল, ফারুক ও সোহেল রানা অভিনীত বাংলাদেশের সেরা সাদাকালো সিনেমাগুলো ছিল আমাদের সময়ে দেখা সেরা চলচ্চিত্র।

আরেকটি স্মৃতি খুব মনে পড়ে ছোটবেলার। সাদাকালো টেলিভিশনে রমজানের শেষে ঈদের চাঁদ দেখা যাওয়ামাত্র আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা, বিশিষ্ট লোকসংগীত শিল্পী আব্বাস উদ্দীনের সুর করা ও ফেরদৌসী রহমানের গাওয়া সেই বিখ্যাত গান ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ। এই গানটি টিভিতে প্রচারিত হওয়ার পরই আমরা বুঝে যেতাম, আজ ঈদ। ঈদের আনন্দে আমাদের মনও আনন্দে নেচে উঠত সে সময়।

ঈদের খুশিকে আরও বেশি আনন্দময় করার জন্য তখন বিটিভিতে প্রচারিত হতো আনন্দমেলা নামে একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান। মনে আছে একবার জনপ্রিয় অভিনেতা, উপস্থাপক আফজাল হোসেন আনন্দমেলা উপস্থাপনা করেছিলেন। সেই ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে গান, স্কিড, নাটক, নাচ, সিনেমা নিয়ে থাকত মজার মজার পরিবেশনা। খুবই উপভোগ্য ছিল সেই ম্যগাজিন অনুষ্ঠান আনন্দমেলা।

বিটিভির ঈদের অনুষ্ঠানমালায় আরও থাকত, দেশের স্বনামধন্য ব্যান্ড শিল্পীদের পরিবেশনায় বিশেষ ব্যান্ডের গান নিয়ে অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানেই আমরা শুনেছিলাম গুরু আজম খান, পিলু মমতাজ, ফকির আলমগীর, নকীব খান, ফেরদৌস ওয়াহিদ, শুভ্রদেব, তপন চৌধুরী, কুমার বিশ্বজিৎ, আইয়ুব বাচ্চু ও জেমসের মনকাড়া পরিবেশনা। সেই ব্যান্ডের গানগুলো এখনও যখন শুনি আমাদের আনন্দ দেয় এবং আমাদের নিয়ে যায় সেই সাদাকালো দিনগুলোতে।

সময় যায়, আমরা বড় হই। বুড়ো হয় আমাদের সাদাকালো টেলিভিশন। কালের বিবর্তনে বাড়িতে বাড়িতে আসে রঙিন টেলিভিশন। এখন তো এইচডি টিভির যুগ, ইউটিউবের যুগ। তবুও ‘আমাদের গেছে যে দিন, একেবারেই কি গেছে? কিছুই কি নেই বাকি?’ হ্যাঁ সেই একসাথে বসে শুধু পরিবারের লোকজন নয়, পুরো পাড়ার লোকজন নিয়ে টিভিবান্ধব যে আনন্দ বিনোদন ছিল বিটিভি যুগে, এখন কি আর সেই আনন্দ খুঁজে পাব কখনো? তবুও স্মৃতিতে অম্লান সেই সাদাকালো টিভির যুগের রঙিন ঈদ আয়োজন। বিটিভির সেই সোনালি দিনগুলো আমাদের শৈশবের আনন্দময় দিনগুলোকে মনে করিয়ে দেয়। জয়তু বিটিভির ঈদ আয়োজন।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ