শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন আর নেই
বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট ছড়াকার ও শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন আর নেই। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। তাঁর মৃত্যুতে দেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি মাহমুদ সেলিম তাঁর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত আখতার হুসেনের মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে। পরে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে তাঁর জন্মস্থান নাটোরের লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে। সেখানেই তাঁর দাফন সম্পন্ন হবে।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর গুরুতর অসুস্থ হয়ে রাজধানীর গ্রিন রোডের গ্রিন লাইফ হাসপাতালে ভর্তি হন আখতার হুসেন। পরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়া হয়। এর আগে চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, তিনি ইসকেমিক স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং তাঁর শারীরিক অবস্থা সংকটজনক ছিল।
১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর নাটোরের লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আখতার হুসেন। সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করা এই সাহিত্যিক পরবর্তী সময়ে ছড়া, গল্প, ছোটগল্প ও নাটক রচনার পাশাপাশি সম্পাদনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। শিশু-কিশোরদের জন্য তাঁর বিপুলসংখ্যক মৌলিক রচনা দীর্ঘদিন ধরে পাঠকের কাছে সমাদৃত হয়ে আসছে।
কর্মজীবনে প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন তিনি। ছড়া, গল্প, ছোটগল্প ও নাটক মিলিয়ে তাঁর রচিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৮০। তাঁর সম্পাদিত উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু’, ‘দুই বাংলার মুক্তিযুদ্ধের কবিতা’, ‘সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী গল্প’, ‘বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ দেশপ্রেমের গান’, ‘বাংলা সাহিত্যের সেরা কিশোর কবিতা’, ‘ও হেনরি শ্রেষ্ঠ গল্প’, ‘মোপাসাঁ শ্রেষ্ঠ গল্প’, ‘ম্যাক্সিম গোর্কি শ্রেষ্ঠ গল্প’ ও ‘মার্ক টোয়েন শ্রেষ্ঠ গল্প’।
জীবনীভিত্তিক সাহিত্যেও তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ রয়েছে। ভাষাশহীদ আবদুল জব্বার, কিশোর শহীদ মতিউর রহমান, হাবীবুর রহমান এবং কাজি আফসারউদ্দিন আহমেদের জীবনী রচনা করেছেন তিনি। পাশাপাশি ‘সত্যেন সেন স্মারক গ্রন্থ’, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসের অ্যালবাম’ ও ‘আলতাফ আলী হাসু স্মারক গ্রন্থ’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনার সঙ্গে সম্পাদনার কাজে যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত পাঁচ খণ্ডের ‘শিশু-বিশ্বকোষ’-এ সর্বাধিকসংখ্যক ভুক্তি লেখকেরও একজন ছিলেন তিনি।
মহান মুক্তিযুদ্ধেও আখতার হুসেনের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর লেখা ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে আজ জাগছে বাঙালিরা, আর রুখবে তাদের কারা’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি পুরস্কার, ভাষাশহীদ আবদুল জব্বার স্মৃতিপদক, মনিরউদ্দীন ইউসুফ সাহিত্য পুরস্কার, এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার ও বজলুর রহমান স্মৃতিপদকসহ বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছেন।
মতামত দিন