Views Bangladesh Logo

স্ক্রিনে বন্দি নাগরিক শৈশব ও অটিজম সচেতনতা

জ ২ এপ্রিল, বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। প্রতিবছর এই দিনটি যখন ফিরে আসে, তখন আমরা অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের অধিকার এবং তাদের সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকরণ নিয়ে নানা আলোচনা করি। কিন্তু প্রযুক্তির অতিদ্রুত উন্নয়ন ও বিস্তারের প্রেক্ষাপটে অটিজম সচেতনতার সমান্তরালে একটি গভীর সংকটের দিকে আমাদের নজর দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে— আর তা হলো বর্তমান যুগের ‘নাগরিক শৈশব’ এবং ডিভাইসনির্ভর জীবনযাত্রার নেতিবাচক প্রভাব। বিশেষ করে শিশুদের অতিমাত্রায় স্ক্রিন আসক্তি কীভাবে তাদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং অটিজমের মতো উপসর্গগুলোকে আরও জটিল করে তুলছে, তা নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা ও পর্যালোচনার সময় এসেছে।

আমরা আমাদের পরের প্রজন্মকে যেন হাতে ধরে এক চরম অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছি। সকাল থেকে রাত— একটি ৩-৪ বছরের শিশু তার দিনের অর্ধেকেরও বেশি সময় পার করছে মোবাইল বা ট্যাব নামক কয়েক ইঞ্চির এক কৃত্রিম জগতে। আকাশ ওরা দেখছে ঠিকই, কিন্তু সেই আকাশ জানালার বাইরের অবারিত নীল নয়, বরং স্ক্রিনের ভেতরে এনিমেটেড কোনো জগতের। প্রজাপতি, ফুল কিংবা পাখির সাথে তাদের পরিচয় হচ্ছে রংবেরঙের পিক্সেলের মাধ্যমে। ফলে মাটির সোঁদা গন্ধ কিংবা মুক্ত বাতাসের স্পর্শ পাওয়ার যে প্রাকৃতিক অধিকার একটি শিশুর থাকে, তা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। এই যে পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্নতা, এটিই মূলত শিশুর স্নায়ুবিক ও সামাজিক বিকাশে এক বড় ধাক্কা।

শিশুরা স্ক্রিনে যে ধরনের গেমস বা ভিডিওতে মেতে থাকছে, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশে সহিংসতা ও নেতিবাচক উপাদানের আধিপত্য দেখা যায়। নিরন্তর যুদ্ধ, মারামারি আর ধ্বংসের ভার্চুয়াল জগতে মত্ত হয়ে শিশুরা বাস্তব জীবনেও সেই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো অজান্তেই ধারণ করতে শুরু করে। তারা জয়ী হওয়া মানেই ভাবছে অন্যকে পরাভূত বা ধ্বংস করা। এই যে প্রতিযোগিতার বিষবাষ্প আমরা তাদের মনে ঢুকিয়ে দিচ্ছি, তা তাদের ভেতরের মানবিক সহমর্মিতা ও সংবেদনশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অভিভাবকরাও সন্তানদের এই প্রতিযোগিতার রিলে দৌড়ে নামিয়ে দিয়ে এক ধরনের মেকি তৃপ্তি পাচ্ছেন। অথচ এই অসুস্থ প্রতিযোগিতাই শিশুর মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে তাকে অন্তর্মুখী করে তুলছে। একা করে তুলছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় অটিজম একটি জটিল স্নায়ুবিক বিকাশগত অবস্থা, যার পেছনে জিনগত ও পরিবেশগত বহুমুখী কারণ থাকে। তবে সাম্প্রতিককালে কিছু বিশেষজ্ঞ অতিমাত্রায় স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট আচরণগত সমস্যাগুলোকে ‘ভার্চুয়াল অটিজম’ সদৃশ ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করছেন। দীর্ঘ সময় একা একা স্ক্রিনে নিমগ্ন থাকার ফলে শিশুরা ‘আই কন্টাক্ট’ বা চোখে চোখ রেখে কথা বলা ভুলে যাচ্ছে। তাদের ভাষা বিকাশে বিলম্ব (Speech Delay) ঘটছে এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় তারা জড়তা অনুভব করছে। যদিও স্ক্রিন টাইম সরাসরি অটিজম সৃষ্টি করে কি না তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক থাকলেও এটি নিশ্চিত যে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার অটিজমের বিদ্যমান লক্ষণগুলোকে আরও প্রকট ও জটিল করে তোলে। শিশুকে সাময়িকভাবে চুপ বা স্থির রাখার সহজ উপায় হিসেবে যখন তার হাতে মোবাইল তুলে দেওয়া হয়, তখন আসলে তার স্বাভাবিক যোগাযোগ শেখার পথটা আমরা সংকুচিত করে দিই।

শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের জন্য নিজের দেশের সংস্কৃতি, ভাষা, শিল্প চর্চার গুরুত্ব বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। আমরা মুখে দেশীয় সংস্কৃতির বুলি আওড়ালেও আমাদের অন্দরমহলে শিশুদের জন্য কী পরিবেশ রাখছি? সকাল হতেই শুরু হয় ভিনদেশি কার্টুন আর সংস্কৃতির আধিপত্য। ঘরের টেলিভিশন থেকে শুরু করে মোবাইল, ট্যাব বা ল্যাপটপের ইউটিউবের অ্যালগরিদম— সবই শিশুকে তার শেকড় থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে দেখা যাচ্ছে, অনেক শিশু নিজের মাতৃভাষার চেয়ে ভিনদেশি বাচনভঙ্গি বা অদ্ভুত এক মিশ্র ভাষায় কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। আমাদের চিরায়ত লোকগল্পের রাজপুত্র কিংবা ডালিমকুমারের বদলে তাদের মনোজগৎ দখল করে নিচ্ছে অতি-মানবিক কোনো যান্ত্রিক চরিত্র। এই সাংস্কৃতিক অনুকরণ শিশুর নিজস্ব আত্মপরিচয় গঠনে বাধা দেয় এবং তাকে এক ধরনের পরিচয়হীন অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেয়।

এই সংকটের দায় এককভাবে কারো নয়, তবে পরিবর্তনের মূল দায়িত্ব রাষ্ট্র ও পরিবার— উভয়কেই নিতে হবে। গতানুগতিক কেবল কতগুলো তাত্ত্বিক আলোচনায় সমাধান আসবে না। আমাদের কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন :

সহ-প্রদর্শন বা Co-viewing : শিশুকে একাকী স্ক্রিনের সামনে ছেড়ে না দিয়ে অভিভাবকরা সাথে থাকতে পারেন। এতে শিশু যা দেখছে তা নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব হয় এবং স্ক্রিনের সাথে তার একমুখী সম্পর্ক তৈরি হয় না।

পারিবারিক সহ-ক্রীড়া : স্ক্রিন টাইমের বিকল্প হিসেবে প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা ‘প্যারেন্ট-চাইল্ড প্লে টাইম’ রাখা জরুরি, যেখানে কোনো ডিজিটাল ডিভাইস থাকবে না।

সামাজিক নেটওয়ার্ক : প্রতিবেশীদের সাথে মিলে শিশুদের ছোট ছোট গ্রুপে খেলার সুযোগ করে দেওয়া বা ‘নেইবারহুড প্লে কালচার’ পুনরুজ্জীবিত করা।

সাংস্কৃতিক সংযোগ : বাসায় দেশীয় গান, আবৃত্তি ও লোকজ গল্পের চর্চা বাড়ানো। আধুনিক ডিভাইসেই দেশীয় ভালো মানের কনটেন্টগুলো শিশুদের সামনে উপস্থাপন করা যেতে পারে। তবে এ বিষয়েও ব্যাপক গবেষণা প্রয়োজন। শিশুতোষ কনটেন্টগুলোও সম্ভব হলে ফোনের ছোট স্ক্রিনে না দেখিয়ে টেলিভিশনের বড় স্ক্রিনে দেখানো উচিত।

বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রতিটি শিশুর সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার অধিকার রয়েছে। আমাদের অঙ্গীকার হোক— আমরা শিশুদের শুধু প্রযুক্তির হাতে ছেড়ে দেবো না। তাদের জন্য এক সুস্থ, আন্তরিক ও মানবিক পরিবেশ তৈরি করব। মনে রাখতে হবে, স্ক্রিনের কৃত্রিম আলো যেন আমাদের শিশুদের নীল আকাশের বিকল্প না হয়ে দাঁড়ায়। আমরা কি চাই একটি বিচ্ছিন্ন, সংবেদনশূন্য ও ক্রমশ যান্ত্রিক হয়ে ওঠা প্রজন্ম? না কি এক সুস্থ, চিন্তাশীল ও সৃজনশীল ভবিষ্যৎ? সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে। সন্তানদের সুস্থ বিকাশের অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের করুণা নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার নৈতিক দায়িত্ব।

মেহেদী হাসান শোয়েব: সাংবাদিক, লেখক ও শিশু সংগঠক

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ