Views Bangladesh Logo

খাদ্যে বিষক্রিয়ায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা: খাদ্য প্রতিমন্ত্রী

খাদ্য ও জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেছেন, খাদ্যে বিষক্রিয়ায় শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এর মূল কারণ খাদ্যদ্রব্যের নিরাপদতার অভাব। আমরা শাকসবজি ও ফলমূলে সীমাহীন কীটনাশক ব্যবহার করছি।

শনিবার দুপুরে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ফেলোশিপ কার্যক্রমের আওতায় ২০২৫–২৬ অর্থবছরের ফেলোশিপের ইনসেপশন সেমিনার ও অনুদানের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর কাজী নজরুল ইসলাম সড়কস্থ বিএফএসএ কার্যালয়ে এ সেমিনার ও চেক বিতরণ অনুষ্ঠিত হয়।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, যেখানে এক কেজি কীটনাশকের প্রয়োজন, সেখানে দেওয়া হচ্ছে তিন কেজি। আবার বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্য রপ্তানির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও খাদ্যের নিরাপদতার ঘাটতির কারণে সেই বাজারে প্রবেশ করা যাচ্ছে না। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে আমাদের নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও বাজারজাত করতে হবে।

খাদ্য ও জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, নিরাপদ খাদ্য খাতে গবেষণার নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ফেলোশিপ নীতিমালা–২০২৪-এর আওতায় বিএফএসএ ‘ফেলোশিপ কার্যক্রম–২০২৬’ চালু করে।

বিএফএসএ’র চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকারের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন খাদ্য সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিএফএসএ’র সদস্য ড. মোহাম্মদ মোস্তফা ও ড. মোহাম্মদ শোয়েব।

খাবারের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ার ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ চিকিৎসায় ব্যয় হচ্ছে উল্লেখ করে মো. আব্দুল বারী বলেন, খাদ্যে ভেজাল সারা পৃথিবীর সমস্যা, আমাদের দেশে আরও বড় সমস্যা। ২০ বছর আগেও এত ক্যান্সার ছিল না, এখন ক্যান্সার বেশি হচ্ছে।

তিনি বলেন, খাদ্যে বিষক্রিয়ায় শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এতে বিপুল পরিমাণ অর্থ চিকিৎসায় ব্যয় হচ্ছে। অথচ খাদ্যে অধিক পরিমাণ রাসায়নিক সার ও কীটনাশক কম ব্যবহার করে জৈব সার প্রয়োগ করলে এ অবস্থা হতো না। তাই সরকার জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতে গুরুত্ব দিচ্ছে।

খাদ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কাজ করার সময় নিজেদের বিবেককে প্রশ্ন করতে হবে। প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে দেশ এগিয়ে যাবে।

তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন দেশে খাদ্যপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। তবে খাদ্যের বিশুদ্ধতার অভাবে রপ্তানি করা যাচ্ছে না। এসব দেশের চাহিদা অনুযায়ী নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করতে হয়, কারণ তারা রপ্তানিতে অনেক কঠোর নিয়ম অনুসরণ করে।

বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে কার্যক্রম বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে খাদ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রতি মাসে বাজারগুলোতে অভিযান চালাতে হবে। এতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের প্রচার বাড়বে এবং আমরা কী খাচ্ছি তা জানতে পারব।

তিনি বলেন, এক কেজির স্থলে তিন কেজি কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। আমে এমন কীটনাশক দেওয়া হয়, যা পাকার সময় বাড়িয়ে দেয়। পাবদা মাছ ও শসাতেও নিয়মিত স্প্রে করা হয়।

আইনের প্রয়োগ কঠোর করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৭ বছরের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে সমাজ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আমাদের এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে।

প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরতদের পদোন্নতি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, নতুন করে জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে। পদোন্নতি ও অন্যান্য সুবিধা বাড়ানো হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমাদের কাজের ক্ষেত্রে দুই ধরনের দায়বদ্ধতা রয়েছে—একটি বিবেকের, অন্যটি আইনের। কর্মকর্তাদের সততা ও দক্ষতা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান এগিয়ে যেতে পারে না।

তিনি বলেন, বছরে ১ শতাংশ করে কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। এজন্য গ্রামগুলোকে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর উপযোগী করে গড়ে তোলা হচ্ছে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আবু তাহের মো. মাসুদ রানা বলেন, বর্তমানে খাদ্যে ভেজাল নীরব ঘাতক হিসেবে কাজ করছে। এ থেকে জাতিকে রক্ষা করতে খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তিনি বিএফএসএ–এর আর্থিক সীমাবদ্ধতার বিষয়ে বলেন, গবেষণার জন্য বরাদ্দের স্বল্পতা দূর করা হবে।

তিনি আরও বলেন, ভোক্তা পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের মুক্তি মিলবে না।

সভাপতির বক্তব্যে মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ফেলোশিপের বেশিরভাগ গবেষণা খাদ্যসংক্রান্ত বিষয়েই হবে। আগামীতে গবেষণার জন্য বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

ফেলো হিসেবে নির্বাচিত হয়ে অনুভূতি ব্যক্ত করেন চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস জেবা। তিনি বলেন, এই ফেলোশিপ আমার মতো গবেষকদের অনুপ্রাণিত করবে এবং দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে ভূমিকা রাখবে।

উল্লেখ্য, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো এ ফেলোশিপ কার্যক্রম চালু করা হয়। এ বছর সাধারণ ফেলোশিপ–১ (এমএস/সমমান) ক্যাটাগরিতে ৩২৩টি আবেদন থেকে ২০ জন ফেলোকে নির্বাচিত করা হয়েছে। ফেলোশিপ নীতিমালায় খাদ্য অণুজীব বিজ্ঞান, খাদ্য রসায়ন, খাদ্য বিষবিদ্যা, খাদ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ, খাদ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, উদীয়মান প্রযুক্তি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি ১৪টি ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে।

সাধারণ ফেলোশিপের আওতায় প্রতি ফেলোকে মাসে ৭ হাজার টাকা হারে বছরে মোট ৮৪ হাজার টাকা প্রদান করা হবে। এছাড়া সুপারভাইজারের সম্মানী হিসেবে এককালীন ৩০ হাজার টাকা এবং গবেষণা ব্যয় হিসেবে এককালীন ৫০ হাজার টাকা—মোট ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা ব্যয় হবে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে ফেলোর সংখ্যা আরও বাড়ানোর এবং নীতিমালা অনুযায়ী এমফিল (সাধারণ ফেলোশিপ–২) ও পিএইচডি (উচ্চতর ফেলোশিপ) পর্যায়েও এ কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করেছে।

ফেলোদের মধ্যে রয়েছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেহেনা সুলতানা আলো, সাইফুল ইসলাম, রাফি হাসনাত সরকার, লাবিব শাহরিয়ার সিয়াম, আফিয়া মুরশিদা তিষা; বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মো. তানভীরুল ইসলাম, শাহরিয়ার আহমেদ, শ্রীমা মন্ডল বর্ষা, সাক্ষ্যজিত সাহা পারিজাত, নুসরাত জাহান নিজু, মো. সাহাব উদ্দিন; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাহফুজ তালুকদার, সিনজুরি হক সোহা; চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবরিনা সিফাত, মো. ইবনুল বখতিয়ার কাইফ, জান্নাতুল ফেরদৌস জেবা; সিলেট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মো. নাজমুল হাসান আরফিন; শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাহনুমা তাবসসুম তাকওয়া এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ার মো. হাবিবুর রহমান প্রমুখ।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ