হাফেজ বানানোর স্বপ্ন ছিল বাবার, শিক্ষকের বেত্রাঘাতে শিশুর মস্তিষ্কে রক্ত জমাট
খুলনা নগরীর সোনাডাঙ্গা থানার ডাক্তারপাড়া এলাকায় নুরুল কুরআন তাহফিজ একাডেমির এক শিক্ষকের বেত্রাঘাতে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছে ৯ বছরের একটি শিশু। এতে তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসায় কাজ না হলে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
গত ১৭ জুন রাতে এ ঘটনাটি ঘটে। নির্যাতনের শিকার শিশুটির নাম ইসমাইল শিকদার। সরকারি কলেজের (প্রাক্তন জয় বাংলা কলেজ) পাশে তার বাড়ি। মুদি ব্যবসায়ী ওমর ফারুক শিকদারের একমাত্র সন্তান সে। কোরআন হাফেজ বানানোর উদ্দেশ্যে গত বছর ওই মাদ্রাসায় ভর্তি করানো হয় ইসমাইলকে।
বেত্রাঘাতের বিষয়টি শিশুর পরিবারকে না জানিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। মারধরের প্রায় ২৪ ঘণ্টা পরে অন্য একটি মাধ্যমের দ্বারা খবর পেয়ে শিশুটির বাবা তাকে উদ্ধার করে। এরপর হাসপাতালে নিতে আরও দেরি হয়। ঘটনার প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পর চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় শিশুটির মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাঁধার বিষয়টি ধরা পড়ে। জানা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালিও। এ কারণে চোখের নিচে, মুখে ও গলায় রক্ত জমে ফুলে গেছে। দুই চোখের নিচে জমাট রক্ত, সারামুখে ও গলায় লালচে ফোলাভাব—শিশুটির এমন অবস্থা দেখে শিউরে উঠছেন সবাই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আমিনুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির দ্বিতলা ভবনের দ্বিতীয় তলা ভাড়া নিয়ে বছর দুয়েক আগে মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন হাফেজ আবদুর রহমান। কোনো নিবন্ধন ছাড়াই ব্যক্তিগত উদ্যোগে চলা এই প্রতিষ্ঠানে হাফেজ, নাজেরা ও শুনানি বিভাগে পড়াশোনা করছে ২০ জন শিক্ষার্থী, যাদের বয়স ৮ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে।
মাদ্রাসার খণ্ডকালীন শিক্ষক হাফেজ মাসুদ জানান, পরদিন আবদুর রহমানের কাছে শুনেছেন, পড়া না পারায় শিশুটিকে বেত দিয়ে মারা হয়। একপর্যায়ে তার মাথা দেয়ালে গিয়ে লাগে। রাতে অসুস্থতার কোনো লক্ষণ না দেখা গেলেও পরদিন সকালে চোখ ও মাথায় রক্ত জমাট বাঁধা দেখে সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ফ্রিজ থেকে বরফ দেওয়া ছাড়া আর কিছু করা হয়নি। রাতে শিশুটির বাবা এসে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
এদিকে এ ঘটনার পর থেকে পলাতক মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা আবদুর রহমান। তার মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। স্থানীয়রা পরে তাকে লাঞ্ছিত করে বের করে দেন বলে জানান হাফেজ মাসুদ।
নির্যাতনের শিকার শিশুটির বাবা ওমর ফারুক শিকদার নিজেও খুলনার দারুল কুরআন সিদ্দিকিয়া মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস পাস করেছেন। পারিবারিক সিদ্ধান্তে একমাত্র ছেলেকে হাফেজ বানানোর স্বপ্ন নিয়ে ওই মাদ্রাসায় ভর্তি করেছিলেন তিনি।
ওমর ফারুক বলেন, 'আগেও ওই শিক্ষক শিশুদের মারপিট করেছে বলে শুনেছি। এভাবে কেউ কাউকে মারতে পারে? মারার ২৪ ঘণ্টা পরও আমাকে জানানো হয়নি। দুই দিন পর ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাই।' মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, 'ছেলে আগে সুস্থ হোক, তারপর ভেবে দেখব।'
এ ব্যাপারে সোনাডাঙ্গা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম জানান, সংবাদ পেয়ে পুলিশ মাদ্রাসায় যায় এবং শিশুটির বাবাকে মামলা করতে বলা হয়।
তিনি বলেন, ‘পরিবার মামলা করলে আমরা ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’
মতামত দিন