জলের ক্যানভাসে চলনবিলের পর্যটন স্বপ্ন
বর্ষার আকাশ যখন মেঘের নীলচে বিষণ্নতা মুছে জলরঙে আঁকা হয়ে ওঠে, তখন চলনবিলও বদলে ফেলে তার চিরচেনা রূপ। দিগন্তজোড়া জলরাশি, দূরে ভেসে থাকা নৌকা, বৈঠার ছলাৎ-ছলাৎ শব্দ, জেলেদের ব্যস্ততা আর শাপলা-শালুকের ঘ্রাণ—সব মিলিয়ে মনে হয়, এটি কোনো বিল নয়; প্রকৃতির নিজের হাতে আঁকা এক বিশাল জলচিত্র।
চলনবিলের সৌন্দর্য অবশ্য শুধু বর্ষায় নয়। শরতে নীল আকাশের প্রতিবিম্ব পড়ে জলের আয়নায়, হেমন্তে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে পাকা ধানের সোনালি হাসি, শীতে কুয়াশার চাদর ভেদ করে ভেসে আসে অতিথি পাখির কলকাকলি। ঋতু বদলের সঙ্গে বদলে যায় চলনবিলের রূপ, আর প্রতিটি ঋতুই হয়ে ওঠে ভিন্ন এক ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা।
নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের বিস্তীর্ণ জনপদজুড়ে ছড়িয়ে থাকা চলনবিল মূলত নদী, খাল, বিল ও জলাভূমির এক বিশাল জলজ নেটওয়ার্ক। আত্রাই, বড়াল, গুমানীসহ নানা নদ-নদী ও জলপথ বর্ষায় একে পরিণত করে বিস্তৃত নৌপথে। নৌকায় চলতে চলতে কখনো নদী, কখনো বিল—মনে হয়, ঢুকে পড়েছি এক অনন্ত জলরাজ্যে।
এই জলরাশির পাশাপাশি চলনবিলের রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য। গুরুদাসপুরের খুবজিপুরে ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত চলনবিল জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে প্রাচীন নিদর্শন, শিলালিপি, টেরাকোটা, মাছ ধরার সরঞ্জামসহ বিলপাড়ের জীবন ও সংস্কৃতির নানা স্মৃতি। আশপাশে রয়েছে চাপিলা শাহী মসজিদ, সিংড়ার ঘাষি দেওয়ানের মাজার, তাড়াশের জমিদারবাড়ি ও চাটমোহরের প্রাচীন স্থাপনাসহ নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন। নদী-বিল, জীববৈচিত্র্য ও এসব ঐতিহ্যকে একটি পর্যটন রুটে যুক্ত করা গেলে চলনবিল হয়ে উঠতে পারে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য।
চলনবিলকে ঘিরে ইকো-ট্যুরিজমের সম্ভাবনাও এখন নতুন করে সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম তাড়াশে গিয়ে চলনবিলকে ঘিরে ইকো-ট্যুরিজম প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কথা জানিয়েছেন। পরিকল্পিত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নৌভ্রমণ, স্থানীয় খাবার, প্রশিক্ষিত গাইড, হস্তশিল্প, কৃষিপণ্য ও লোকজ সংস্কৃতিকে ঘিরে তৈরি হতে পারে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র।
তবে পর্যটনের আগে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন—চলনবিলকে বাঁচানো। দখল, পলি জমা, নাব্যতা হ্রাস, জলপ্রবাহে বাধা ও অপরিকল্পিত স্থাপনার কারণে এর স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে। যে জলরাশিকে ঘিরে পর্যটনের স্বপ্ন, সেই জলরাশিই যদি সংকুচিত হয়ে যায়, তাহলে সেই স্বপ্নও একদিন হারিয়ে যাবে।
তাই চলনবিলের পর্যটন উন্নয়ন হতে হবে প্রকৃতিবান্ধব। নিরাপদ নৌভ্রমণ, পাখি পর্যবেক্ষণ, পরিবেশবান্ধব কটেজ, স্থানীয় খাবার ও লোকসংস্কৃতির আয়োজনের পাশাপাশি বর্জ্য ও প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে কঠোর ব্যবস্থা। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে যুক্ত করতে হবে সমন্বিত পর্যটন পরিকল্পনায়।
চলনবিল শুধু একটি জলাভূমি নয়; এটি মাটি, মানুষ, মাছ, পাখি, নৌকা, লোকগান ও জীবনযাত্রার এক জীবন্ত গল্প। সেই গল্পকে বাঁচিয়ে, প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়ে পর্যটনের নতুন দুয়ার খুলতে পারলে জলের এই বিশাল ক্যানভাসে আঁকা হতে পারে একটি জনপদের নতুন স্বপ্ন।
মতামত দিন