Views Bangladesh Logo

শতবর্ষী গুণীজন

শতবর্ষী বাঙালি: পর্ব ১

প্রাগ্‌ভাষ: ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে,’— মাইকেল মধুসূদনের এই কবিবাক্যটি শাশ্বত ও মানুষমাত্রের কাছেই সতর্কতামূলক আপ্তবাক্য। ‘মানুষ মরণশীল,’ এই ধ্রুবপদটি আমরা জেনেও ভুলে থাকি। সেজন্যই মহাভারতে যুধিষ্ঠিরের একটি বিখ্যাত উক্তি, ‘প্রতিদিন অগণিত মানুষ মারা যায়, অথচ সে ভাবে, আমি মরব না! এর চেয়ে আশ্চর্যের আর কী-ই বা হতে পারে,’— ‘কিমাশ্চর্যমতঃ পরম্?’

পৃথিবীতে মানুষ বাঁচে কতোদিন? দেখা গেছে, সাধারণভাবে মানুষের গড় আয়ু বড়োজোর একশো বছর। আশ্চর্যের কথা, গ্লাস স্পঞ্জের (Glass Sponge) পনেরো হাজার বছর বাঁচার ইতিহাস রয়েছে। মেথুসেলাহ্ (Methuselah) নামে ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত গাছটির বয়স বিজ্ঞানীরা বের করেছেন প্রায় ৪৮৫০ বছর। হাওয়াইয়ের কিছু প্রবাল পাঁচ হাজার বছরের আয়ু নিয়ে এখনো জীবিত। কচ্ছপ পর্যন্ত চার-পাঁচশো বছর বাঁচে। সেই তুলনায় মানুষের আয়ু নিতান্তই কম।

পৃথিবীর ইতিহাসে প্রমাণসহ রেকর্ডকৃত দীর্ঘায়ু মানুষের তালিকায় আছেন ফ্রান্সের জিন ক্যালমেঁ (Jeanne Calment)। তিনি বেঁচেছিলেন ১২২ বছর ১৬৪ দিন। তার জন্ম ১৮২৫-এ, মৃত্যু ১৯৯৭-তে। অন্যদিকে জাপানের জিরোয়েমন কিমুরা (Jiroemon Kimura) ও ব্রিটেনের মহিলা এথেল ক্যাটারহ্যাম (Ethel Caterham) বেঁচেছিলেন যথাক্রমে ১১৬ বছর ৫৪ দিন, ও ১১৫ বছর ২১৬ দিন।

ভারতীয়দের মধ্যেও কারো কারো শতবর্ষাধিক আয়ু লাভের ঘটনা শোনা যায়। তাদের অন্যতম হচ্ছেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর দেহরক্ষী ও ড্রাইভার কর্নেল নিজামউদ্দীন, যিনি মায়ানমারে নেতাজীকে বাঁচাতে নিজে গুলির সামনে বুক পেতে দিয়েছিলেন। সৌভাগ্যক্রমে বেঁচেও যান। ২০১৭-তে মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ১১৭ বছর। তার স্ত্রী অজবুল নিশাও সেসময় ১০৭-বর্ষীয়া ও জীবিত।

শতবর্ষী বাঙালি


বাঙালিদের মধ্যেও শতায়ু লোক নেহাত কম নেই। একটা কথা মনে রাখা জরুরি, বিখ্যাত ব্যক্তি ছাড়া সাধারণ মানুষের আয়ু নিয়ে বিশেষ কোনো গবেষণা থাকে না। আবার একটু বেশি বয়স্ক মানুষকে শতায়ু বলে চালিয়ে দেওয়ার রেওয়াজও রয়েছে। তবে শতবর্ষের আয়ুলাভ যে মানুষের কাঙ্ক্ষিত, তা উপনিষদের একটি বাক্যে সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে, ‘জীবেম শরদঃ শতম্’, অর্থাৎ শতবর্ষ বাঁচতে ইচ্ছে করবে। কেবল অলস জীবন নিয়ে বাঁচবার ইচ্ছে করলেই হবে না, কর্ম করে বাঁচার কথাও বলা হয়েছে সেখানে, ‘কুর্বন্নেবেহ কর্মাণি জিজীবিষেচ্ছতম্ সমাঃ’।

শতায়ু বাঙালি: ইতিহাসে প্রথম


মধুসূদন সরস্বতী (১৫৪০-১৬৪৩): মধ্যযুগের এক বিখ্যাত বাঙালি পণ্ডিত ছিলেন মধুসূদন সরস্বতী, যিনি সমগ্র ভারতব্যাপী সম্মানিত ছিলেন। পূর্ববঙ্গের ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়ায় তার জন্ম, ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে, ও মৃত্যু ১৬৪৩-এ। তিনি বিখ্যাত একজন অদ্বৈতবাদী মনীষী ছিলেন। তার লেখা ‘অদ্বৈতসিদ্ধি’ গ্রন্থ তাকে সারা ভারতে খ্যাতি এনে দেয়। তিনি ছিলেন শ্রীচৈতন্য-নানক-তুলসীদাসের সমসাময়িক। কাশীতে তার শিক্ষা, দিল্লিতে সম্রাট আকবরের সাক্ষাৎলাভও ঘটেছিল তাঁর।

লালন ফকির: তার পরিচয় দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না। জন্ম ১৭৭৪-এ, রাজা রামমোহন যে-বছর জন্মান (মতান্তরে রামমোহন ১৭৭২-এ জন্মান)। লালন প্রয়াত হন ১৮৯০-এর ১৭ অক্টোবর। শ্রীরামকৃষ্ণ-ঈশ্বরচন্দ্র-মধুসূদন দত্ত-মীর মশাররফ-বঙ্কিমচন্দ্র-রবীন্দ্রনাথ-বিবেকানন্দ তারই সময়কার। লালন তার গান ও মরমী সাধনায় আঠারো-উনিশ শতকের বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক সম্ভ্রান্ত অধ্যায়। দুই বঙ্গে অগণিত বাউল তার বাণী দেশে দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছেন আজও, সুদূর ভবিষ্যৎ পর্যন্ত দিয়ে যাবেন।

রসিক মোহন বিদ্যাভূষণ (১৮৩৮-১৯৪৭): বীরভূমের একচক্রা গ্রামে জন্ম এই বৈষ্ণবসাধক তথা লেখকের। সিপাহি বিদ্রোহ একদিকে, অন্যদিকে ভারতের স্বাধীনতা, এই দুই ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়ে তার জীবন আবর্তিত। লিখেছেন চল্লিশটির ওপর গ্রন্থ। গিরীশচন্দ্র ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। ‘শ্রীকৃষ্ণ মাধুরী’, ‘রায় রামানন্দ’, ‘বিদ্যাপতি-চণ্ডীদাস’ তার বিখ্যাত গ্রন্থ।

ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ (০৮.১০.১৮৬২-০৬.০৯.১৯৭২): উপমহাদেশের স্বনামধন্য সঙ্গীতশিল্পী। তার উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতসাধনা, বিশেষ করে সেতার, সরোদ, সুরবাহার ইত্যাদি যন্ত্রসঙ্গীতের, ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীত-ইতিহাসের এক দীর্ঘ, ব্যাপ্ত ও সম্ভ্রান্ত অধ্যায়। তার অগণিত শিষ্যের মধ্যে ছিলেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর, নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, নিজ পুত্র আলী আকবর খাঁ, তিমিরবরণ, বাহাদুর খান। তিনি পান্নালাল ঘোষকে যেমন বাঁশি বাজানো শিখিয়েছেন, ভি.জি. যোগকে তেমনি শিখিয়েছেন বেহালা। এমনকি চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটক কিছুদিন সেতার শেখেন তাঁর কাছে। তাঁর সেরা শিষ্য কিন্তু ছিলেন তার কন্যা অন্নপূর্ণা, যার সঙ্গে রবিশঙ্করের বিয়ে হয়েছিল। বিখ্যাত ‘মাইহার ব্যান্ড’ ছিল তার।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিবপুরে জন্ম তার। মধ্যপ্রদেশের মাইহারে জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটান। ১৯৩৫-এ নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্করের সঙ্গী হয়ে ইউরোপ ভ্রমণ করেন। রানি এলিজাবেথ তাকে ‘সুরসম্রাট’ উপাধি দেন। ভারত সরকার দেয় ‘পদ্মবিভূষণ’, বিশ্বভারতী দেয় ‘দেশিকোত্তম’। দিল্লি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেয় সম্মানসূচক ডি.লিট., আর সমগ্র বিশ্ব শ্রদ্ধা ও সম্মান।

উল্লেখ্য, আলাউদ্দীন খাঁর কন্যা অন্নপূর্ণা দেবী (১৯২৭-২০১৮) মাত্র আট বছরের জন্য শতায়ু হতে পারেননি!

শতবর্ষী বাঙালি: পর্ব ২

মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন (২০.১১.১৮৮৮-১১.০৬.১৯৯৪): চাঁদপুরে জন্ম। ১৯১৮-তে কলকাতা থেকে প্রকাশিত তার সম্পাদিত ‘সওগাত’ বাংলা সাহিত্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘস্থায়ী পত্রিকা। এই পত্রিকা বাঙালি মুসলমানদের আত্মপ্রকাশের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। বেগম রোকেয়া, বেগম সুফিয়া কামাল, মোতাহেরা বানু বেগম থেকে বহু মুসলিম মেয়েকে তিনি তার পত্রিকায় স্থান দেন। কাজী নজরুল ইসলামের বহু লেখা এখানে বেরিয়েছে। তাই বলে তার কাছে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়রাও ব্রাত্য ছিলেন না। ১৯৫০-এ তিনি ঢাকা গিয়ে নতুন উদ্যমে পত্রিকা বের করলেন। ১৯২৬-এ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও কাজী আব্দুল ওদুদ যে ‘বুদ্ধির মুক্তির আন্দোলন’ শুরু করেছিলেন, ‘সওগাত’ ছিল তার পূর্বসূরী। ১৯৪৬-এ তিনি মেয়েদের জন্যও পত্রিকা বের করেছিলেন, ‘বেগম’। এখানে তিনি রক্ষণশীলদের উপেক্ষা করে মেয়েদের লেখা তো বটেই, ছবিও ছাপেন। সাংবাদিক, লেখক ও সাহিত্য আন্দোলনে নিবেদিতপ্রাণ এই মানুষটি মুসলিম রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এক বলিষ্ঠ আদর্শ রেখে গেছেন। তরুণ লেখকদের উৎসাহ দান করতে তিনি ১৯৭৬ সাল থেকে নিজের নামে ‘নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক’ পুরস্কার চালু করেন। সৈয়দ আলী আহসান, সৈয়দ শামসুল হক, সিকান্দার আবু জাফর, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ প্রমুখ এই পুরস্কার পেয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার তাকে ‘একুশে পদক’ (১৯৭২) ও ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ (১৯৮৪) প্রদান করে।

নীরদ সি. চৌধুরী (২৩.০১.১৮৯৭-০২.০৮.১৯৯৯): ‘বিতর্কিত’ লেখক, বিদগ্ধ পণ্ডিত এবং বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি। জন্ম বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জে, কাটিয়াদিতে। বিদ্যালয়-জীবন কিশোরগঞ্জে কাটিয়ে কলকাতায় পড়তে আসেন রিপন কলেজে (অধুনা সুরেন্দ্রনাথ কলেজ)। এখানে তার সহপাঠী ছিলেন প্রথিতযশা সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। পরবর্তীকালে তিনি, বিভূতিভূষণ এবং ‘ঠাকুরমার ঝুলি’-খ্যাত দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার কলকাতার একই মেসে থাকতেন।

কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস নিয়ে ভর্তি হলেও পরীক্ষা দেননি। চাকরিসূত্রে কলকাতা ও দিল্লিতে ছিলেন। এসময় থেকেই লেখালেখির সূত্রপাত। লিখতেন মডার্ন রিভিউ, শনিবারের চিঠি, প্রবাসী-তে। ১৯৩৭-এ নেতাজীর অগ্রজ শরৎচন্দ্র বসুর সচিব হওয়ার সূত্রে গান্ধী, নেহরু, নেতাজী প্রমুখ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সাহচর্যে আসেন। ১৯৪১-এ যোগ দেন আকাশবাণীর দিল্লি কেন্দ্রে। ১৯৫৫-তে প্রথম বিদেশযাত্রা।

পরে তিনি ১৯৫৫ থেকে বিলেতেই থিতু হন। ১৯৫১-তে বেরোয় তার আত্মজীবনী, ‘The Autobiography of an Unknown Indian’। এরপর একে একে ‘Thy Hand, Great Anarch’, ‘The Continent of Circe’ (১৯৬৫), ‘বাঙালী জীবনে রমণী’, ‘আত্মঘাতী রবীন্দ্রনাথ’, ‘আত্মঘাতী বাঙালী’ ইত্যাদি গ্রন্থ। সব বই-ই বিচিত্র বিষয়ের, আর ‘বিতর্কিত’।

অনেক মহার্ঘ্য পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের হাত থেকে ‘Commander of the Order of the British Empire’ (CBE, ১৯৯২), বিশ্বভারতী থেকে ‘দেশিকোত্তম’, দিল্লির ‘সাহিত্য অকাদেমি’, অক্সফোর্ডের সাম্মানিক ডি.লিট.।

শতায়ু এই মানুষটি আমৃত্যু লেখালেখি করে গিয়েছেন। প্রখ্যাত লেখক-সম্পাদক খুশবন্ত সিং ছিলেন নীরদ সি.’র বন্ধু ও গুণগ্রাহী, যিনি মনে করতেন, নন-ফিকশন লেখকরূপে নীরদ সি. অসাধারণ। প্রসঙ্গত, তার স্ত্রী অমিয়া চৌধুরীও লেখালেখি করতেন। অমিয়ার একটি বিখ্যাত বই ‘থোড় বড়ি খাড়া’।

বিনোদবিহারী চৌধুরী (১০.০১.১৯১১-১০.০৪.২০১০): তার নাম ১৯৩০ সালের চট্টগ্রাম সশস্ত্র অভিযানের সঙ্গে যুক্ত, মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে যে বিদ্রোহ ব্রিটিশের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। বিপ্লবীরা চারদিন স্বাধীন ভারতের পতাকা উড়িয়েছিলেন চট্টগ্রামে। কবি সুকান্ত চট্টগ্রাম নিয়ে লেখেন এই অমর পঙ্‌ক্তি, ‘জালালাবাদের পথ ধরে ভাই, ধর্মতলার পথে, / দেখবে ঠিকানা লেখা প্রত্যেক ঘরে—’। হ্যাঁ, জালালাবাদের পরেই তো ঘটেছিল কলকাতায় বিনয়-বাদল-দিনেশের রাইটার্স অভিযান, অলিন্দযুদ্ধ।

বিনোদবিহারীর জন্ম চট্টগ্রামের বোয়ালখালিতে। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩৯ সালে মাস্টার্স করার আগেই বিপ্লবী দলে যোগ দিয়ে কারাবাস করেন। ১৮.০৪.১৯৩০-এর ঐতিহাসিক দিনটিতে তিনি ও তার সহযোগী বিপ্লবীরা— অনন্ত সিংহ, গণেশ ঘোষ, আনন্দ গুপ্ত, হিমাংশু সেন প্রমুখ— জালালাবাদ পাহাড়ে লড়াই চালান। সুবোধ রায় নামে ১৪ বছরের এক বালকও এতে যোগ দেয়। নেতৃত্বে সূর্য সেন। বিনোদবিহারী নিজে গুলিবিদ্ধ হন, আর তার চোখের সামনে বাইশ জনকে শহীদ হতে দেখেন।

সাতচল্লিশে দেশভাগের পর তিনি চট্টগ্রামেই থেকে যান। রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন ১৯৫৮ পর্যন্ত। সেসময় আইয়ুব খান মার্শাল ল জারি ও সব রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে রাজনীতি থেকে সরে আসেন। চট্টগ্রামে ওকালতি করতেন। বাংলাদেশ সরকার এই যশস্বী বীরকে ‘স্বাধীনতা পদকে’ ভূষিত করে।

দিলীপকুমার রায় (২৯.০৪.১৯১৭-২৩.০৯.২০২২): তিনি কবি-নাট্যকার-গীতিকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ছেলে নন। কান্তকবি রজনীকান্তের বড় মেয়ে শান্তিলতা দেবীর পুত্র। জন্ম পাবনার ভাঙাবাড়িতে। সঙ্গীতশিক্ষার সূচনা মায়ের কাছে। ১৯৩৮-এ রসায়নে বি.এস.সি. করেন। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়াতেন। মাতামহ রজনীকান্তের গানের প্রচারের পাশাপাশি তার গানের সুর সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৩৮-এ তার প্রথম রেকর্ড বেরোয়। আকাশবাণী কলকাতার শিল্পী ছিলেন ১৯৩৯ থেকে। ছিলেন এইচ.এম.ভি.’র প্রশিক্ষকও। রজনীকান্তের গান ছাড়াও রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদের গান, আধুনিক গানও গাইতেন। বহু বিখ্যাত শিল্পী তার পরিচালনায় গানের রেকর্ড করেছেন। যেমন পঙ্কজ কুমার মল্লিক, কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়, ছবি বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, অর্ঘ্য সেন। নিজেও গান লিখতেন। পান্নালাল ভট্টাচার্য তার কথাতেই এই গানগুলো রেকর্ড করেছিলেন, ‘আমি মন্ত্রতন্ত্র কিছুই জানি নে মা’, ‘আমি সব ছেড়ে মা ধরবো তোমার রাঙা চরণ দুটি’।

তার প্রচেষ্টায় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সঙ্গীত একাডেমি দুই খণ্ডে ‘কান্তকবির গান’-এর স্বরলিপি বের করে।

শতবর্ষী বাঙালি মহিলা


এ-পর্যন্ত কেবল পুরুষদের নাম উল্লেখ করলেও তালিকায় বাঙালি মহিলা শতবর্ষীদের নামও কিন্তু বেশ বড়। দেখা যাক একে একে।

হটু বিদ্যালঙ্কার (১৭৭৫-১৮৭৫): রাজা রামমোহন রায়ের (১৭৭২, মতান্তরে ১৭৭৪-১৮৩৩) সমসাময়িক তিনি। বর্ধমানের সাধক ও শ্যামাসঙ্গীতকার কমলাকান্তেরও (১৭৬৯-১৮২১) সমসাময়িক! হটুর জন্ম বর্ধমানের কলাইঝুটি গ্রামে। সেই আমলে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ প্রায় ছিল না বললেই চলে। রাসসুন্দরী দাসী, নবাব ফয়জুন্নেসা, বেগম রোকেয়া যে কী আগ্নেয় অভীপ্সায় লেখাপড়া শিখেছিলেন, এমনকি পরবর্তীকালে বেগম সুফিয়া কামাল বা আশাপূর্ণা দেবী, তা ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়।

হটু তো ব্রাহ্মণও ছিলেন না! তবু তিনি ব্যাকরণ, স্মৃতিশাস্ত্র, চিকিৎসাবিদ্যা রপ্ত করেছিলেন সারগ্রামনিবাসী আচার্য গোকুলানন্দ তর্কালংকারের কাছে। চিরকুমারী হটু পুরুষের মতোই মুণ্ডিতমস্তক ও উপনয়নধারী ছিলেন, এবং মাথায় শিখা পর্যন্ত রাখতেন। ন্যায়, স্মৃতি, কাব্য, নব্যন্যায় ও চিকিৎসাবিদ্যাবিশারদ হটুর কাছে পুরুষরাও যেতেন বিদ্যালাভ করার জন্য। কাশীতেও তিনি বিদ্যাশিক্ষায়তন (টোল) খুলেছিলেন।

সে-যুগে হটী বিদ্যালঙ্কার নামে অন্য একজন বিদুষী ছিলেন। দুজন কিন্তু আলাদা। এঁর অন্য নাম ‘রূপমঞ্জরী’।

লীলা মজুমদার (২৬.০২.১৯০৮-০৫.০৪.২০০৭): কলকাতার জোড়াসাঁকো যেমন অসামান্য সব প্রতিভার জন্ম দিয়েছে, ময়মনসিংহের (বর্তমান কিশোরগঞ্জের) মশুয়াও তেমনি। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায়, সত্যজিৎ রায় ছাড়াও বহু প্রথিতযশাকে জন্মদানের জন্য মশুয়া বিখ্যাত।

শতবর্ষী বাঙালি: পর্ব ৩

লীলা মজুমদার উপেন্দ্রকিশোরের ছোটভাই প্রমদারঞ্জনের মেয়ে। মা সুরমা দেবী। সুকুমারের বোন, সত্যজিৎ রায়ের পিসি। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে প্রথম হন এম.এ.-তে। ১৯৩৩-এ বাড়ির অমতে সুধীর মজুমদারকে বিয়ে করেন। পুত্র রঞ্জন, কন্যা কমলা। ১৯৫৬-তে কলকাতা বেতারকেন্দ্রে যোগ দেন। পরে শান্তিনিকেতনে অধ্যাপনা করেন।

সাহিত্যজগতে তার হাতেখড়ি ১৯২২-এ, মাত্র ১৪ বছর বয়সে, উপেন্দ্রকিশোর-সম্পাদিত ‘সন্দেশ’ পত্রিকায়। মূলত ছোটদের জন্য লিখতেন। পরবর্তীতে এই পত্রিকাটির সহ-সম্পাদক ছিলেন ১৯৬৩ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত (সম্পাদক সত্যজিৎ রায়)। অজস্র গল্প-উপন্যাস লিখেছেন। তার বিখ্যাত কয়েকটি বইয়ের নাম হলো ‘নাকুগামা;, ‘মাকু’, ‘সব ভূতুড়ে’, ‘পদিপিসির বর্মি বাক্স’ (এটির চলচ্চিত্ররূপ দেন অরুন্ধতী মুখোপাধ্যায়), ‘খেরোর খাতা’ ইত্যাদি। ‘পাকদণ্ডী’ তার আত্মজীবনী। আরও আছে, ‘আর কোনোখানে’।

পেয়েছেন আনন্দ পুরস্কার, বিশ্বভারতীর ‘দেশিকোত্তম’, সঙ্গীত নাটক একাডেমি পুরস্কার, বিদ্যাসাগর, ভুবনেশ্বরী, ভুবনমোহিনী দাসী পুরস্কার। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডি.লিট. দেয়।

অমলা শঙ্কর (২৭.০৬.১৯১৯-২০.০৭.২০২০): তিনি জন্মেছিলেন সাবেক যশোর, বর্তমান মাগুরা জেলায়। পিতা সে-আমলের প্রখ্যাত স্বর্ণব্যবসায়ী অক্ষয় নন্দী।

১৯৩১ সালটি অমলার জীবনে অবিস্মরণীয়। সে বছর প্যারিসে ‘International Colonial Exposition’ উপলক্ষ্যে যে বাণিজ্যিক প্রদর্শনী হয়, তাতে তার পিতা অক্ষয় নন্দী স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে যোগ দিতে গেলে বারো বছর বয়সী তার কন্যা অমলাও তার সঙ্গে যান। সেখানে তখন উদয়শঙ্কর তার নাচের দল নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানেই উদয়শঙ্করের সঙ্গে তার আলাপ, পরিচয়, অবশেষে পরিণয়।

কিশোরী অমলাশঙ্কর তার ওই ভ্রমণ নিয়ে বইও লেখেন, ‘সাত সাগরের পার’। সে বই রবীন্দ্রনাথ, সুভাষচন্দ্রকে মুগ্ধ করেছে।

উদয়শঙ্কর-অমলাশঙ্কর ছিলেন কিংবদন্তি নৃত্যশিল্পী। উদয়শঙ্কর আলমোড়ায় যখন ‘India Cultural Centre’ স্থাপন করেন, তাতে অমলার ভূমিকা ছিল বিরাট। ১৯৪৮-এ উদয়শঙ্কর ‘কল্পনা’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করলেন, উমার ভূমিকায় অসাধারণ অভিনয় করেছেন তিনি। ছবিটি ২০১২-তে কান চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হলে অমলা আমন্ত্রণ পান সেখানে।

নৃত্যের পাশাপাশি অমলা ছবিও আঁকতেন। দেবর রবিশঙ্কর, ছেলে আনন্দশঙ্কর, মেয়ে মমতাশঙ্কর, পুত্রবধূ তনুশ্রীশঙ্কর, সকলেই স্বনামধন্য। ১৯৯১-তে পেয়েছেন ‘পদ্মভূষণ’, ২০১২-তে ‘বঙ্গবিভূষণ’।

জাহান আরা রহমান (২৭.১২.১৯২২-?): এই বিদুষী মহিলা ছিলেন কলকাতায় অবস্থিত লেডি ব্রেবোর্ন কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। তার জন্ম কুমিল্লায়। ১৯৩৯-এ ফার্স্ট ডিভিশনে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৪৬-এ ডাক্তার মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।

লেখালেখি করতেন ‘বেগম’সহ নানা পত্রপত্রিকায়। ১৯৬০-এ ‘All Pakistan Association’-এর পূর্ব পাকিস্তানের সভাপতি হিসেবে মারি (Murree) গিয়েছিলেন। পঞ্চাশের দশকে খুলনায় বন্যা হলে তিনি ত্রাণ নিয়ে সেখানে যান। ঢাকার লালমাটিয়ায় W.V.A. কলেজটি তার উদ্যোগে স্থাপিত হয়। ২০১৪-এ ব্রেবোর্ন কলেজ তাকে সংবর্ধনা দেয়।

জীবনে বহু বিখ্যাত লোকের সান্নিধ্য পেয়েছেন। গান্ধী, জিন্নাহ, সোহরাওয়ার্দী ও আরও বহু। দুবার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা হয় জোড়াসাঁকোতে।

তালিকার শেষ ব্যক্তি

আমাদের তালিকা শেষের দিকে। একটা বিষয় লক্ষণীয়, তালিকার সবাই পূর্ববঙ্গের। এটা কি এখানকার জলবায়ুর গুণ? ভাববার বিষয়। তালিকায় বাদ পড়ে থাকবেন হয়তো কেউ কেউ, তবে তা স্বেচ্ছাকৃত নয়, অনবধানতার কারণে।

অন্তিমে যে মানুষটির কথা জানাব তিনি শতবর্ষজীবী ছিলেন তো বটেই, নিজ জন্মগ্রহণের জাদুতে তিন তিনটি শতাব্দীর সাক্ষী হয়ে আছেন। জন্মেছিলেন সপ্তদশ শতাব্দীতে, আর প্রয়াত হন অষ্টাদশ শতকে। কে তিনি?

জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন (১৩.০৯.১৬৮৪-১৯.১০.১৮০৭): তার জন্মের সময় ভারত সম্রাট ছিলেন ঔরঙ্গজেব, আর মৃত্যুকালে জন্মান আধুনিক ইতালির স্রষ্টা গ্যারিবল্ডি। জন্মস্থান হুগলির ত্রিবেণীতে। অসাধারণ শ্রুতিধর ছিলেন, ছিলেন ব্যাকরণ ও স্মৃতিশাস্ত্রে পণ্ডিত। তখনকার ব্রিটিশ শাসকরা দেশীয় বিচারপদ্ধতি ও আইন প্রণয়নের জন্য তাঁর শরণ নিতেন। নব্যন্যায়ের ওপর নানা ভাষ্য লেখেন। ‘অষ্টাদশ বিবাদের বিচার’, ‘বিবাদভঙ্গার্ণব’ তার অক্ষয় কীর্তি। শেষের গ্রন্থটি একটি সংকলন, দীর্ঘ ৯৭০ পৃষ্ঠার বিপুল যে গ্রন্থে তিনি বিখ্যাত নৈয়ায়িকদের রচনা তুলে ধরেছেন। চার বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে এটির সংকলন শেষ হয়। সেকালের রাজা-মহারাজা— মহারাজ নন্দকুমার, রাজা নবকৃষ্ণ, বর্ধমানরাজ কীর্তিচন্দ্র প্রমুখ— যেমন, তেমনি ওয়ারেন হেস্টিংস, জন শোর, কোলব্রুক ও উইলিয়াম জোনসের সঙ্গেও তার হৃদ্যতা ছিল। সেই আমলে মাসিক তিনশো টাকা বেতনে তিনি কোম্পানির আইন-উপদেষ্টা হন।

তার পিতা বিখ্যাত পণ্ডিত রুদ্র দেব তর্কবাগীশ, মা সুশীলাদেবী। ছিল নিজের শিক্ষাসত্র— চতুষ্পাঠী বা টোল— যেখানে তিন শতাধিক ছাত্র পড়াশোনা করত, থাকত-খেত।

আমাদের তালিকায় ইনিই একমাত্র, যার জন্ম পশ্চিমবঙ্গে।

শেষকথা: আরও কোনো কোনো বাঙালি শতবর্ষের দোরগোড়ায় পৌঁছতে গিয়েও দুই, তিন বা পাঁচ বছরের জন্য শতবর্ষী হতে পারেননি। যেমন অন্নদাশঙ্কর রায়, মৃণাল সেন, বদরুদ্দীন উমর, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, শঙ্কর (মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়)। আফসোস হয় এজন্য। এ যেন ক্রিকেটে সেঞ্চুরি করার ঠিক আগে আউট হওয়া। এঁদের নিয়ে বারান্তরে লেখা যাবে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ