Views Bangladesh Logo

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনী বন্ধের প্রচারণা: নির্মাতা ও সংগঠনের নিন্দা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আগামীকাল শনিবার নির্ধারিত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার প্রদর্শনীটি বন্ধ করে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পক্ষ সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের প্রচারণাকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে এলাকায় ও অনলাইনে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় সিনেমাটির নির্মাতা ও প্রযোজক তানিম নূর গভীর ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি বিষয়টিকে দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মন্তব্য করেছেন এবং চলচ্চিত্র প্রদর্শনকে ঘিরে এ ধরনের বাধা সৃষ্টির প্রচেষ্টার নিন্দা জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, পুরো ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপ। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি বলেছে, সিনেমা প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া শিল্প ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য অস্বস্তিকর এবং এটি চলচ্চিত্রের মুক্ত পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

‘চলচ্চিত্র চর্চায় নতুন প্রজন্ম, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নবদিগন্ত’—এই স্লোগান সামনে রেখে গত ১০ মে যাত্রা শুরু করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি। নিয়মিত চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, আড্ডা, আলোচনা সভা ও কর্মশালার মাধ্যমে জেলায় একটি সৃজনশীল সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ইতোমধ্যে তারা আয়োজন করেছে ‘ভাতঘুমের সিনেমা আড্ডা’র আটটি পর্ব। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ৩০ মে অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে আয়োজন করা হয়েছে নবম প্রদর্শনীর। সেখানে প্রদর্শিত হওয়ার কথা রয়েছে ঈদুল ফিতরে মুক্তিপ্রাপ্ত আলোচিত চলচ্চিত্র ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। তবে প্রদর্শনীর প্রচারণা শুরু হতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনাসহ এর বিরোধিতা শুরু হয়েছে। বিষয়টি ঘিরে স্থানীয় সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও চলচ্চিত্রকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ।

সংবাদমাধ্যমের হাতে আসা একাধিক ফেসবুক পোস্ট এবং মেসেঞ্জার গ্রুপের স্ক্রিনশট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনী বন্ধের দাবিতে সংগঠিতভাবে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বিভিন্ন পোস্ট ও বার্তায় সিনেমাটির প্রদর্শনী বাতিলের আহ্বান জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া চলচ্চিত্রটির পোস্টারের ওপর লাল রঙ ব্যবহার করে ‘ক্রস’ (এক্স) চিহ্ন এঁকে সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা দ্রুত বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও গ্রুপে ভাইরাল হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে নেটিজেনদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে এবং এটি ঘিরে অনলাইন পরিবেশে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে আবু বকর মোহাম্মদ আয়মান নামের এক ব্যক্তি লিখেছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আলেম-ওলামার শহর। এই শহরে একসময় আল্লামা ফখরে বাঙ্গাল (রহ.) সিনেমা বন্ধ করেছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, কিছু কুচক্রী মহল আবারও শহরে সিনেমা চালু করার চেষ্টা করছে।

একই ধরনের বক্তব্য ‘সাংগঠনিক ঐক্য’ নামে একটি মেসেঞ্জার গ্রুপেও ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে, যেখানে বিষয়টি নিয়ে একই অবস্থান পুনরায় তুলে ধরা হয়।

এইচ এম সৈয়দ কাসেম নামে আরেকজন তার পোস্টে লেখেন, “আলেম-ওলামার শহরে সিনেমা নামক নিষিদ্ধ জিনিস প্রদর্শনী দেখতে চাই না।” এ ছাড়া এইচ এম কাজী আকরাম, মো. সাকিবুল হাসান চৌধুরী ও আরিফ বিল্লাহ মুজাহিদসহ আরও কয়েকজন একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে প্রদর্শনীর বিরোধিতা করেছেন।

ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চলচ্চিত্রটির নির্মাতা তানিম নূর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সম্প্রতি ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমাটি প্রদর্শনীতে বাধা দেওয়ার যে খবরটি দেখলাম, তা সত্যিই অত্যন্ত দুঃখজনক। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সবসময়ই ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির উর্বর ভূমি। পোস্টে তিনি আরও লেখেন, সুস্থ বিনোদন ও শিল্পের চর্চা কখনো আমাদের সমাজ কিংবা বিশ্বাসের ক্ষতি করে না, বরং মানসিক বিকাশ ঘটায়। অনাকাঙ্ক্ষিত কোনও নিষেধাজ্ঞার চেয়ে পারস্পরিক আলোচনা ও শ্রদ্ধাবোধ অনেক বেশি প্রয়োজন। একজন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সন্তান হিসেবে এই ঘটনাকে “মর্মাহত” বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া চলচ্চিত্র সংসদ–এর সাধারণ সম্পাদক বখতিয়ার শাহরিয়ার বলেন, আমরা আগামী ৩০ মে প্রদর্শনীটি সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে চাই। কিন্তু ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই প্রগতিশীল উদ্যোগের বিরোধিতা করে পোস্ট দিতে দেখছি। বিষয়টি নিয়ে আমরা অবশ্যই উদ্বিগ্ন। তবে আমরা আশা করছি, তারা আমাদের এই শো বন্ধ করতে পারবে না। আমরা স্থানীয় প্রশাসনকে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবো এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা চাইবো।

এদিকে সুস্থ ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, চলচ্চিত্রকর্মী এবং চলচ্চিত্রপ্রেমীরা ইতোমধ্যেই প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেছেন। তাদের মতে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ে গড়া জনপদে শিল্প, সাহিত্য এবং চলচ্চিত্রচর্চার স্বাভাবিক পরিবেশকে কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত বা সংকুচিত করা উচিত নয়।

একটি মুক্ত ও উদার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে তুলতে হলে চলচ্চিত্র প্রদর্শনসহ সব ধরনের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। এ ধরনের উদ্যোগে বাধা সৃষ্টি হলে তা সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় শিল্পচর্চার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ