জ্বালানি খাতে ‘লুটপাট বন্ধের’ তাগিদ ক্যাব নেতাদের
জ্বালানি খাতের অনিয়ম ও ‘লুটপাট’ বন্ধ করে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি দেশের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে চলমান সংকট মোকাবিলার আহ্বান জানিয়েছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) নেতারা। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট এবং অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা থেকে বিভিন্ন ওষুধ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেছেন তারা।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সেগুনবাগিচায় ক্যাবের কার্যালয়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অপ্রতুলতা এবং অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন বক্তারা।
সভায় ক্যাব সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সময় লাগতে পারে। তবে খাতে যে চুরি ও অপচয় হচ্ছে, তা বন্ধ করতে কোনো দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমলেও গ্রাহকদের বিল কমছে না; বরং বিদ্যুতের দাম গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ বাড়লেও অনেকের বিল ১০০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সরবরাহ কমার পরও বিল অস্বাভাবিকভাবে বাড়লে সেখানে অনিয়ম বা লুণ্ঠনের বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আমদানিনির্ভরতা বাড়িয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন সফিকুজ্জামান। তিনি বলেন, সংকট তৈরি হওয়ার পর উন্মুক্ত দরপত্রের বদলে সরাসরি ক্রয়ের পথে গেলে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের প্রথম কাজ হিসেবে চুরি ও লুণ্ঠন বন্ধের পাশাপাশি পরিস্থিতি সম্পর্কে জনগণকে স্বচ্ছ তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
দেশের চার শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও তৈরি পোশাক খাত জ্বালানি সংকটে পড়ায় রপ্তানি আদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পরিবহন খাতেও পড়েছে বলে মন্তব্য করেন ক্যাব সভাপতি। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পরিবহন ব্যয় বেড়ে সবজি ও অন্যান্য পণ্যের দামও অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে সিস্টেম লস এবং প্রায় ২০ শতাংশ চুরি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
ওষুধের নীতিগত পরিবর্তনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, দেশের ওষুধশিল্প বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১৫০টি দেশে রপ্তানি করছে এবং দেশের ৯৮ শতাংশ চাহিদা পূরণ করছে। অথচ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা থেকে হঠাৎ করে অনেক ওষুধ বাদ দেওয়ায় সাধারণ মানুষ ও শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সভায় বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, যেসব এলাকায় গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে না, সেসব এলাকায় গ্রাহকদের কাছ থেকে বিল নেওয়া বন্ধ রাখা উচিত। তিনি জানান, গ্যাস উন্নয়ন তহবিলে কয়েক বছর আগে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা জমা ছিল এবং বর্তমানে তা ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে।
তার অভিযোগ, ওই অর্থ গ্যাস উত্তোলনের পরিবর্তে এলএনজি আমদানি ও পাইপলাইন নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এলএনজি আমদানিতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও গ্যাস উত্তোলনে পর্যাপ্ত অর্থ দেওয়া হয়নি।
ভুল নীতি ও দুর্নীতির কারণেই জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে দাবি করে রুহিন হোসেন প্রিন্স অতীতে জ্বালানি নীতি প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানান। একই সঙ্গে বর্তমান সরকারকে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের অপ্রতুলতা দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া, কোষাধ্যক্ষ শওকত আলী খান, সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, বাংলাদেশ সাধারণ নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ ও ক্যাবের উপদেষ্টা খলিলুর রহমানসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
মতামত দিন