কুমিল্লা ট্রেন-বাস সংঘর্ষে পরিবারের সবাইকে হারিয়ে নির্বাক বাসচালক নিজেই
কুমিল্লা জেলার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং এলাকায় বাস ও ট্রেনের ভয়াবহ সংঘর্ষে বাসটির চালক পিন্টু মিয়া নিজেই হারালেন তার পরিবারের সবাইকে। স্ত্রী ও দুই কন্যাকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছেন পিন্টু।
পেশায় বাসচালক পিন্টু যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করেই জীবিকা নির্বাহ করতেন, অথচ সেই একই পরিবহন ব্যবস্থার এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় হারালেন নিজের পরিবারকে।
ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার বাসিন্দা পিন্টু মিয়া সপরিবারে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের মানিকদী এলাকায় থাকতেন। তিনি ‘মামুন স্পেশাল’ পরিবহনে চালক হিসেবে কাজ করতেন। ঈদুল ফিতরের ছুটিতে তিনি স্ত্রী ও দুই কন্যাকে নিয়ে ঝিনাইদহে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন।
ঈদের দিন বিকেলে তিনি তার স্ত্রী লাইজু আক্তার এবং তাদের দুই মেয়ে—ছয় বছর বয়সী খাদিজা আক্তার ও সাড়ে তিন বছর বয়সী মরিয়ম আক্তারকে—লক্ষ্মীপুরের হাজিরহাটে শ্বশুরবাড়িতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, পিন্টু তার স্ত্রী, কন্যাদের নিয়ে ‘মামুন স্পেশাল’-বাসে ওঠেন। বাসিটির চালক ছিলেন পিন্টু হোসেন নিজেই। তবে ঢাকা পর্যন্ত গাড়ি চালিয়ে আসার পর পিন্টু সেখানে চালক বদল করে ব্যক্তিগত কাজে নিজে নেমে যান। তার স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তান বাসে থেকে যান। পথে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় পৌঁছালে বাসটি ট্রেন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই মা ও দুই শিশুসহ ঝিনাইদহের পাঁচ যাত্রী প্রাণ হারান।
শনিবার (২১ মার্চ) দিবাগত রাত প্রায় ৩টার দিকে পদুয়ার বাজার এলাকার একটি রেলক্রসিংয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী একটি ট্রেনের সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে চট্টগ্রামগামী ‘মামুন স্পেশাল’ নামের একটি যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের পর ট্রেনটি বাসটিকে প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়, ফলে হতাহতের সংখ্যা বাড়ে।
খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। নিহতদের মরদেহ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে এবং আহতদের সেখানে ভর্তি করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ট্রেনযাত্রীরা অভিযোগ করেন, রেলগেটের দায়িত্বে থাকা সিগন্যালম্যানের অবহেলার কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। তারা আরও জানান, জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ একাধিকবার ফোন করা হলেও তাৎক্ষণিক সাড়া পাওয়া যায়নি, যা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক মো. ইদ্রিস জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, রেলক্রসিংয়ে যথাযথ সিগন্যাল না থাকায় বাসটি রেললাইনে উঠে পড়েছিল।
কুমিল্লা ইপিজেড পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে রাতেই উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করা হয়।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. অজয় ভৌমিক জানান, হাসপাতালে এখন পর্যন্ত ১২ জনের মরদেহ আনা হয়েছে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে