Views Bangladesh Logo

বাজেটে ব্যয় বাড়ল ১৯ শতাংশ, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন দেখাল সরকার

অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এবারের বাজেটের শিরোনাম রাখা হয়েছে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’।

প্রস্তাবিত বাজেটের আকার বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট ছিল ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। নতুন বাজেট দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশের সমান।

জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতির বিদ্যমান দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করেই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করা।

নতুন বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা।

মোট বাজেটের মধ্যে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বাড়িয়ে ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশ করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয়ের অনুপাত কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

পরিচালন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট পরিচালন ব্যয়ের ২১ শতাংশেরও বেশি।

এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৮৯ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা।

নতুন বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি।

এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা কর আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ভ্যাট খাত থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ ২৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা এবং আয়কর ও মুনাফার ওপর কর থেকে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারের লক্ষ্য মধ্যমেয়াদে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করা।

প্রস্তাবিত বাজেটে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান বা ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ৫ শতাংশের নিচে ঘাটতি রাখার নীতি বজায় রেখেছে সরকার।

এই ঘাটতি পূরণে সরকার বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভর করবে।

বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় বিদেশি উৎস থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদরা অবশ্য সতর্ক করেছেন, ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য ঋণপ্রবাহে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ১৪ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ।

তবে নতুন অর্থবছরে সরকার মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং একই সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর মাধ্যমে প্রবৃদ্ধির নতুন ধারা তৈরি করতে চায় সরকার। নতুন বাজেট সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের রূপরেখা হিসেবে কাজ করবে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ