Views Bangladesh Logo

নমিনি পরিচালক ইস্যুতে নীতিমালার সমন্বয় জরুরি

বাংলাদেশে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত কোনো কোম্পানির নমিনি পরিচালকের পদত্যাগ বা অপসারণ-সংক্রান্ত বিষয়ে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস (আরজেএসসি) এবং ব্যাংকিং খাতে অনুসৃত প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি বাস্তব অসামঞ্জস্য বিদ্যমান।

কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ অনুযায়ী কোনো করপোরেট শেয়ারহোল্ডার যদি পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তার মনোনীত পরিচালককে পরিবর্তন করে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত কাগজপত্র আরজেএসসি-তে দাখিল করে, তাহলে আরজেএসসি ওই পরিচালকের পদত্যাগ বা অপসারণ নথিভুক্ত করে এবং কোম্পানির সরকারি রেকর্ড হালনাগাদ করে। ফলে কোম্পানি আইনের দৃষ্টিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আর ঋণখেলাপি কোম্পানির পরিচালক হিসেবে গণ্য হন না।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ব্যাংক ও ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অনুমোদন প্রক্রিয়ায় ওই নমিনি পরিচালকের অব্যাহতির স্বীকৃতি না দেওয়া পর্যন্ত তাঁকে ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবেই বিবেচনা করে। ফলে আরজেএসসি-তে আইনগতভাবে পরিচালকের পদ শেষ হওয়ার পরও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তিনি খেলাপি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে চিহ্নিত থাকেন।

নমিনি পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার পরিচালকের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য
এই সমস্যার মূল কারণ হলো নমিনি পরিচালক এবং শেয়ারহোল্ডার বা উদ্যোক্তা পরিচালক—এই দুই ধরনের পরিচালকের ভূমিকার মধ্যে যথাযথ পার্থক্য না করা।

একজন শেয়ারহোল্ডার বা উদ্যোক্তা পরিচালক সাধারণত কোম্পানির শেয়ারের মালিকানার ভিত্তিতে পরিচালক হন এবং কোম্পানির পরিচালনা, কৌশলগত সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন। শেয়ারের মালিকানা থাকার কারণে তাঁরা দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন এবং করপোরেট গভর্ন্যান্সে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

অন্যদিকে নমিনি পরিচালক কেবল কোনো করপোরেট শেয়ারহোল্ডারের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তাঁর পদটি ব্যক্তিগত মালিকানাভিত্তিক নয়, বরং সম্পূর্ণ প্রতিনিধিত্বমূলক। ব্যক্তিগতভাবে শেয়ারের মালিক হওয়ার কারণে তিনি পরিচালক হন না এবং সাধারণত কোম্পানির ওপর স্বাধীন নিয়ন্ত্রণও প্রয়োগ করেন না। যতদিন তিনি মনোনয়নকারী করপোরেট শেয়ারহোল্ডারের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, ততদিনই তাঁর পরিচালক পদ বহাল থাকবে।

প্রয়োজন হলে করপোরেট শেয়ারহোল্ডার পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যেকোনো সময় তাঁর নমিনি পরিচালককে প্রত্যাহার বা পরিবর্তন করতে পারে এবং আরজেএসসি-তে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়ার মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এসব আইনগত প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের সব ধরনের ক্ষমতা হারান।

শেয়ারহোল্ডার বা উদ্যোক্তা পরিচালকদের ক্ষেত্রে মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের কারণে কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্ক অব্যাহত থাকলেও নমিনি পরিচালক কেবল প্রতিনিধিত্বমূলক দায়িত্ব পালন করেন। মনোনয়নকারী প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁদের পরিবর্তন হওয়া করপোরেট চর্চার একটি স্বাভাবিক ও প্রচলিত বিষয়।

দায়িত্ব পালনকালে সব পরিচালকই একই ধরনের আইনগত ও ফিডিউশিয়ারি দায়িত্বের অধীন থাকেন। তবে নমিনি পরিচালকের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, মনোনয়ন আইনগতভাবে প্রত্যাহার হওয়ার পর কোম্পানির মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ বা করপোরেট গভর্ন্যান্সে তাঁর আর কোনো ভূমিকা থাকে না।

অতএব আরজেএসসি যখন আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর পরিচালক পদ সমাপ্তির বিষয়টি নথিভুক্ত করেছে, তখনো ব্যাংকিং উদ্দেশ্যে তাঁকে ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা বিদ্যমান আইনগত ও করপোরেট বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বাস্তব প্রভাব
এই অসামঞ্জস্যের কারণে গুরুতর অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়, বিশেষ করে যখন একই ব্যক্তি অন্য একটি আর্থিকভাবে সুস্থ প্রতিষ্ঠানে নমিনি পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সেই প্রতিষ্ঠান নতুন ঋণ সুবিধার জন্য আবেদন করে।

দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠানটির কোনো ঋণখেলাপি ইতিহাস না থাকলেও, আর্থিক অবস্থা শক্তিশালী হলেও এবং সব ধরনের নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণ করলেও অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক সেই প্রতিষ্ঠানের ঋণ আবেদন বিলম্বিত বা প্রত্যাখ্যান করে। কারণ ব্যাংকের রেকর্ডে সংশ্লিষ্ট নমিনি পরিচালক তখনও পূর্বের ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে বিবেচিত হন।

ফলে কোম্পানি আইন অনুযায়ী যে সম্পর্ক ইতিমধ্যে বৈধভাবে শেষ হয়ে গেছে, সেই অতীত সম্পর্কের কারণে একটি আর্থিকভাবে সুস্থ প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে শুধু ঋণপ্রাপ্তিতে বিলম্বই ঘটে না, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয়, ব্যবসা সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হয় এবং অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়।

নীতিগত সুপারিশ

এই সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সমন্বিত নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে, যার আওতায় ব্যাংকগুলো তিনটি বিষয় যাচাই করে একজন নমিনি পরিচালকের অব্যাহতির স্বীকৃতি দেবে—মনোনয়নকারী করপোরেট শেয়ারহোল্ডারের পরিচালনা পর্ষদের যথাযথভাবে অনুমোদিত সিদ্ধান্ত (Board Resolution), সংশ্লিষ্ট আইনগত করপোরেট নথিপত্র এবং আরজেএসসি-এর হালনাগাদ করা সরকারি রেকর্ড।

এসব যাচাই সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে নমিনি পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আর ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত হবে না।

এ ধরনের নীতিমালা ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যাংকের শৃঙ্খলা বা ঋণ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে দুর্বল করবে না; বরং এটি আরজেএসসি-এর সরকারি রেকর্ডে প্রতিফলিত আইনগত অবস্থানের সঙ্গে ব্যাংকিং কার্যক্রমের সমন্বয় ঘটাবে। একই সঙ্গে এটি নিশ্চিত করবে যে আর্থিকভাবে সুস্থ কোনো প্রতিষ্ঠান কেবল অতীতে আইনগতভাবে সমাপ্ত একটি নমিনি পরিচালকের সম্পর্কের কারণে বৈধ ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে না।

এ ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রক নিশ্চয়তা বাড়াবে, বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে, করপোরেট সুশাসনকে আরও কার্যকর করবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কতামূলক (prudential) নীতিমালার অখণ্ডতা বজায় রেখেই অর্থায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান একটি অনিচ্ছাকৃত প্রতিবন্ধকতা দূর করবে।

লেখক: কাজী সালাউদ্দিন; কোম্পানি সেক্রেটারি, ফাইবার অ্যাট হোম

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ