একের পর এক খুন, স্বজন হারানোর শহর বগুড়া
ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচনে ভোট দিতে আসেন আলাল শেখ। সেখান থেকে তাকে টেনেহিঁচড়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাকে নির্জন জায়গায় নিয়ে হাতুড়ি দিয়ে পেটানো হয়। সেইসাথে তার হাত-পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে হাসপাতালে মারা যান আলাল। ঘটনাটি বগুড়ার।
গত ২৮ মার্চ আলালকে বগুড়া শহরের ফতেহ আলী বাজার থেকে প্রকাশ্যে দিনের বেলায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে শহরের মালগ্রাম ডাবতলা এলাকায় নিয়ে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। পরে ৩ এপ্রিল ভোরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়েছে।
আলাল বগুড়া শহরের চকসূত্রাপুর কসাইপাড়া এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। ফতেহ আলী বাজারের কাঁচামাল ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির নির্বাচনে তিনি সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী ছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, যুবদল নেতা শফিকুল ইসলাম ও তার সহযোগীরা আলালকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে নির্যাতন করেন। পরে তার মৃত্যু হয়। শফিকুল ইসলাম জেলা যুবদলের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন।
শুধু আলাল হত্যাকাণ্ডই নয়, বগুড়ায় খুনের পর খুন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের ৬ এপ্রিল পর্যন্ত বগুড়ায় ২৩ জনকে হত্যার খবর পাওয়া গেছে।
আলাল শেখ হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মতই আরেকটি রোমহষর্ক ঘটনা ঘটে এ জেলায়।
২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর রাত ১১ টার দিকে সানোয়ার হোসেন ল্যাদো নামের আহত এক যুবদল কর্মীকে গাড়িতে করে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে নিয়ে আসে পুলিশ। ওই সময় তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে পুলিশের গাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে নামানোর চেষ্টা করেন যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কিছু নেতাকর্মী (ল্যাদোর প্রতিপক্ষ)। প্রথম দফায় ব্যর্থ হলেও কিছুক্ষণ পরই পুলিশের সামনেই শজিমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগেই তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ওই সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা পুলিশ সদস্যরাও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
এর আগে, একই দিন রাত ৯ টার দিকে বগুড়ায় গোকুল এলাকায় সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মিজানুর রহমানকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সদরের গোকুল ইউনিয়ন যুবদলের বহিষ্কৃত আহ্বায়ক সুমন আহমেদ বিপুলের নেতৃত্বে হামলা চালিয়ে মিজানুর রহমানকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ। আর ল্যাদো হলো বিপুলের অনুসারী। মিজান হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে ল্যাদোকে মারধর করা হয়। গোকুল এলাকায় ল্যাদোকে ধরে মারধর করেন নিহত মিজানের সহযোগীরা। এক পর্যায়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে শজিমেক হাসপাতাল নেয়। সেখানে মিজানের অনুসারীরা ল্যাদোকে আবারও মারধর করলে তিনি নিহত হন।
পুলিশ জানায়, গত ৩ বছরে বগুড়ায় ২২৬টি খুনের মামলা হয়। এরমধ্যে ২০২৩ সালে ৭৭, ২০২৪ সালে ৯১ ও ২০২৫ সালে ৫৮ জন খুন হন। পুলিশের দেওয়া তথ্যর সঙ্গে ২০২৬ সালের হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া ২৩ জন যোগ করলে এই সময়ের মধ্যে বগুড়ায় খুনের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৪৯ জনে।
জানতে চাইলে বগুড়ার পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, খুনের ঘটনা ঘটলেও পুলিশ দ্রুত আসামি গ্রেফতার করছে এবং এ বিষয়ে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, খুনের ঘটনা প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
জানতে চাইলে বগুড়ার জজ কোর্টের আইনজীবি দিলরুবা নূরী ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, বগুড়ায় দিন দিন খুনের ঘটনা মহামারী রূপ ধারণ করেছে। এই ঘটনাগুলোকে অপরাধ বিজ্ঞান দিয়ে বিশ্লেষণ করে পদক্ষেপ নেয়া উচিত। অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির পিছনের কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম বিচারহীনতা, বিচারে দীর্ঘসূত্রীতা এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি। যার ফলে মানুষ ছোট-খাটো বিষয়েও আর আইন ও বিচার ব্যবস্থার উপর আস্থা না পাওয়ায় আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা ক্ষমতাসীন হওয়ায় বা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় জামিন পেয়ে বা খালাস পেয়ে বেরিয়ে এসে দাপটের সাথে সমাজে প্রভাব বিস্তার করায় অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। তার সাথে ব্যক্তিকেন্দ্রীক, ভোগবাদী সংস্কৃতি মানুষের মননে প্রভাব বিস্তার করায় অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ঘুষ-দূর্নীতির, রাজনৈতিক প্রভাবের
ঊর্ধ্বে উঠে কঠোর ভূমিকা রাখতে হবে। বিচারহীনতা ও দীর্ঘসূত্রীতা দূর করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সেইসাথে সামাজিক মূল্যবোধের সাংস্কৃতিক চর্চা বৃদ্ধিতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। রাজনৈতিক ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহার নয়, গণতান্ত্রিক চর্চায় সহনশীল মনোভাবের বিস্তার ঘটাতে হবে। তবেই পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে