বিএনপির অপরিণামদর্শীর কারণেই আওয়ামী লীগ বার বার ওয়াকওভার পেয়ে যাচ্ছে
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রণ-দামামা পুরোমাত্রায় বেজে উঠেছে। এরই মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ২৯৮টি আসনের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছে। জাতীয় পার্টিও প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ করছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে ‘যোগসাজশ’ করে নির্বাচনের পক্ষে নামা খুচরা দলগুলোও পুরোদমে নির্বাচনি তৎপরতা চালাচ্ছে; কিন্তু যাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ও প্রত্যাশিত; সেই বিএনপি তার দোসরদের নিয়ে রাজপথে কাটাবে বলেই স্থির করেছে। তারা এখনো নির্বাচনি তপশিল বাতিল ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে কখনো হরতাল, কখনো অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করছে। শুক্র-শনি ও মঙ্গলবার বিরতি দিয়ে হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করে চলেছে। যদিও তাদের এই হরতাল বা অবরোধ কেউ মানছে না। বিএনপির নেতাকর্মীদেরও মাঠে দেখা যাচ্ছে না। দলের মূল নেতাদের কয়েকজন বর্তমানে জেলে আছেন। বাকিরা গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে আছেন।
অনেকেরই ধারণা ছিল, বিএনপি হয়তো ক্ষমতাসীনদের ‘অপ্রস্তুত’ করতে শেষ মুহূর্তে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। আবার কারও কারও ধারণা ছিল, জাতীয়-আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর মধ্যস্থতায় ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে কোনো একটা গোপন সমঝোতা হবে; কিন্তু তেমন কিছুই ঘটেনি। বিএনপি তাদের চিরাচরিত আন্দোলন ও নির্বাচন বর্জনের পথেই আটকে রয়েছে। এই সুযোগে ক্ষমতাসীনরা বিএনপিবিহীন নির্বাচনের মাঠে কিছু ‘দুর্বল খেলোয়াড়’ জোগাড় করে, প্রতিপক্ষ হিসেবে তাদের দাঁড় করিয়ে অপ্রতিরোধ্য বিজয়ের পথে ধেয়ে চলেছে।
অথচ এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। বিএনপির অপরিণামদর্শীতার কারণেই আওয়ামী লীগ বার বার ওয়াকওভার পেয়ে যাচ্ছে! রাজনীতিতে বিএনপির বিপুল সমর্থন দেশের বা দলের কোনো কাজে আসছে না। ভুল রণনীতি ও কৌশলের কারণে দলটি ক্রমাগত সংকটের গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে। যে ধরনের আন্দোলন করলে আওয়ামী লীগের মতো গণভিত্তিসম্পন্ন একটি দলকে পদত্যাগে বাধ্য করানো যায়। গত দুই দশক ধরে বিএনপি কখনোই তেমন আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। ২০১৩-১৪ সালে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনের নামে দলটি দেশব্যাপী ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। সে সময় বিভিন্ন যানবাহন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর পেট্রোল বোমা হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় বহু মানুষ প্রাণ হারান। সেই সন্ত্রাসী আন্দোলনের পর সরকার কঠোর হলে বিএনপি একটু একটু করে নিস্তেজ হয়ে যায়। ২০১৮ সালের নির্বাচনে অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নিয়ে বিএনপি নামকাওয়াস্তে অংশগ্রহণ করে এবং ক্ষমতাসীনদের কারসাজির কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এরপর অনেক দিন চুপচাপ থেকে দলটি আবারও আন্দোলন শুরু করে।
গত দুই বছরে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে বিএনপি তার সমর্থন ও ইমেজ অনেকটাই পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা অহিংস আন্দোলনের পথে স্থির থাকতে পারেনি। গত ২৮ অক্টোবর ঢাকায় মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে দলের নেতাকর্মীরা আবারও সহিংস হয়ে ওঠে। প্রধান বিচারপতির বাসভবনে হামলা হয়। হামলা হয় পুলিশের ওপরেও। ক্ষমতাসীনরা বিএনপিকে শায়েস্তা করতে এমন একটা পরিস্থিতির অপেক্ষায় ছিল। এ সহিংসতার অভিযোগে বিএনপির নেতাকর্মীদের নামে মামলা দিয়ে তাদের কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। এরপরও সংযত না হয়ে বিএনপি একের পর এক হরতাল ও অবরোধ দিতে থাকে। বিভিন্ন গাড়িতে অগ্নিসংযোগও করে। এসব অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পুলিশ বিএনপির নেতাকর্মীদের নামে গণহারে মামলা করে। তাদের দ্রুত বিচার আইনে শাস্তিও দেয়া হয়। রাজপথে আবারও দুর্বল হয়ে পড়ে বিএনপি। তারা না পারছে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করতে, না পারছে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে। ওদিকে নির্বাচনেও তারা আসছে না। এতে করে দলের নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে পড়ছে। দলটি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এর জন্য বর্তমান নেতৃত্বকেই দায়ী করছেন।
বিএনপির নেতা মানেই হচ্ছে তারেক রহমান। গত তিন দশক ধরে দলটি পরিচালিত হচ্ছে তারেক রহমানের ইচ্ছায়। কাগজে-কলমে অনেক নেতা থাকলেও তিনিই দলের সর্বময় সিদ্ধান্তগ্রহণকারী। ২০০১-এর নির্বাচনের সময় বিএনপির রাজনীতিতে যখন তারেক রহমান নাম লিখিয়েছিলেন তখন কেউ কেউ খুব আশান্বিত হয়েছিল। তখন অনেকে রাজনীতিতে তরুণ নেতার আগমনকে স্বাগত জানিয়েছিল এ ভেবে যে, অন্তত দুর্নীতির অভিযোগমুক্ত একজন তরুণ ক্ষমতাসীন দলের হাল ধরতে যাচ্ছেন। আর যারা দুই নেত্রীর কর্মকাণ্ডে বিরক্ত তারাও তারেক রহমানকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত ছিলেন; কিন্তু তাদের মোহভঙ্গ হতে বেশি দিন সময় লাগেনি।
২০০১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের পরপরই তারেক রহমানের নেতৃত্বে ‘হাওয়া ভবন’ হয়ে ওঠে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। দুর্নীতির আখড়া হিসেবেও দেশ-বিদেশে ব্যাপক পরিচিত লাভ করে ভবনটি। ২০০৯ সালের ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনার ছক আঁকা হয় এ ভবনে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, হরকাতুল জেহাদ নেতা এবং বঙ্গবন্ধুর খুনিদের কয়েক জন সেখানে একসঙ্গে বসে ঠিক করেছিল, ‘দেশ ও ইসলামের’ শত্রু শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে হবে। সে অনুযায়ী খুনিদের গ্রেনেড সরবরাহ এবং তাদের জন্য পাসপোর্ট তৈরি করিয়ে বিমানবন্দর দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছিল হাওয়া ভবন থেকেই।
যে বিএনপি ভীষণ রকম ‘আমেরিকাপ্রেমী’ এই আমেরিকাই তারেক রহমানকে দুর্নীতির অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে না দিতে ঢাকা দূতাবাস ওয়াশিংটনে গোপন বার্তা পাঠিয়েছিল। আলোচিত ওয়েবসাইট উইকিলিকসের ফাঁস করা ওই বার্তা ২০০৮ সালের ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস থেকে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরে পাঠানো হয়েছিল। এতে বলা হয়, ‘রাজনৈতিকভাবে সংঘটিত’ ব্যাপক মাত্রার দুর্নীতির জন্য তারেক দায়ী বলে দূতাবাস মনে করে। আরও বলা হয়: ‘তারেক রহমান সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত বিষয় এবং রাজনৈতিক পদ দেয়ার ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে যত্রতত্র ঘুষ চাওয়ার জন্য কুখ্যাত। দুর্নীতিপ্রবণ সরকার এবং বাংলাদেশের সহিংস রাজনীতির এক দৃষ্টান্ত তিনি।’
বিএনপি ক্ষমতা ছাড়ার পর ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে দুর্নীতির অভিযোগে তারেক রহমানকে আটক করা হয়। দুর্নীতি ও অবৈধভাবে বিদেশে অর্থ পাচার ও চাঁদাবাজির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ১৫টি মামলাও করা হয়। সে সময় তাকে নির্যাতন করে মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে দেয়া হয়েছে বলে বিএনপি অভিযোগ করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সব মামলায় জামিন নিয়ে তিনি ‘চিকিৎসার জন্য’ লন্ডনে যান। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর একাধিক মামলায় তার জামিন বাতিল করে পলাতক দেখিয়ে বিচার কাজ শুরু করে। এসব মামলায় একের পর এক দণ্ড ঘোষণা করেন আদালত।
অর্থ পাচারের মামলায় ২০১৩ সালে তারেক রহমানকে প্রথমে অব্যাহতি দিয়েছিলেন নিম্ন আদালত। পরে রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের পর হাইকোর্ট ৭ বছরের কারাদণ্ড দেন। পাঁচ বছর পর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে তারেকের কারাদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়। রায়ে বেগম খালেদা জিয়ার ৫ বছর ও তারেকের হয় ১০ বছর সাজা। একই বছরের ১০ অক্টোবর ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার দায়ে তারেক রহমানের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের দুই মামলায় কয়েকটি ধারায় তাকে তিনবার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। সেইসঙ্গে বিস্ফোরক আইনের আরেকটি ধারায় তার ২০ বছর সাজা হয়। ২০২৩ সালের ২ আগস্ট জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের দায়ে তারেক রহমানকে ৯ বছর কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যাকে বাংলাদেশের সহিংস রাজনীতির দৃষ্টান্ত বলে মনে করছে, সেই তারেক রহমান এখন বিএনপির রাজনৈতিক কলাকৌশল পুরোটাই ঠিক করে দিচ্ছেন। লন্ডনে বসে তিনি যেমন আদেশ-নির্দেশ দিচ্ছেন, বিএনপি সেটাই বাস্তবায়ন করে চলেছে। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, শেখ হাসিনা বিদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না।
তারেক রহমান চায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসুক। বিএনপি ক্ষমতায় এলেই কেবল সম্ভব তারেকের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সব মামলা প্রত্যাহার ও নির্বাহী আদেশে দণ্ড মওকুফ করানো। তা না হলে প্রচলিত আইনে দণ্ডিত ব্যক্তি হিসেবে তারেক রহমান রাজনীতি করতে পারবেন না। আর শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকলে বিএনপির ক্ষমতায় আসা এবং ‘সব কিছু অনুকূলে নিয়ে’ তারেক রহমানের রাজনীতি করার সুযোগ ফিরে পাওয়াটা কঠিন ব্যাপার। তাই তারেক রহমানের এমন গো-ধরা।
বিএনপি আসলে তারেক রহমানের ইচ্ছের কাছে বন্দি একটি দল। তার কারণে বিএনপির মতো একটি বড় রাজনৈতিক দল দেশের রাজনীতিতে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারছে না। বেহুদা আন্দোলন করতে গিয়ে বঞ্চিত হচ্ছেন নেতাকর্মীরা। তাদের সীমাহীন অত্যাচার নির্যাতনও সহ্য করতে হচ্ছে। তারেক রহমানের ইচ্ছে পূরণের এই অসার আন্দোলনের কারণে দেশবাসীও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
বিএনপি যদি তারেক রহমানের ইচ্ছায় পরিচালিত না হয়ে নির্বাচনকে ‘আন্দোলনের অংশ’ বানিয়ে ২০১৪ সালেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করত, তাহলে এতদিনে দলের এবং দেশের চেহারা ভিন্ন হতে পারত; কিন্তু তারা বার বার একই ভুল করছে। এদিকে প্রতি বার নির্বাচনের ট্রেনে বিএনপির কিছু কিছু নেতাকর্মী উঠে বসছেন। এবারও বেশ কয়েকজন বিএনপি নেতা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন। এভাবে চলতে থাকলে এক সময় বিএনপিতে কেবল তারেক রহমান ছাড়া আর কাউকে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।
লেখক: কলামিস্ট

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে