না ফেরার দেশে বীরাঙ্গনা রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের বীরাঙ্গনা রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি আর নেই। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকার পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিজ বাড়িতে মারা যান তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।
পরিবার জানিয়েছে, শুক্রবার বিকেলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হবে।
ফুলমতির ছেলে মনিরাজ কুমার জানান, তাঁর মা দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। প্রায় দুই বছর আগে তিনি ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। এতে তাঁর ডান হাত ও পা অবশ হয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি প্রায় পুরোপুরি শয্যাশায়ী ছিলেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিজ ঘরেই তাঁর মৃত্যু হয়।
লেখক ও গবেষক জহুরুল কাইয়ুম সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক প্রকাশনা ‘হৃদয়ে একাত্তর’-এ ফুলমতির জীবনের বিভিন্ন তথ্য লিপিবদ্ধ রয়েছে। সেখানে তাঁকে ‘ফুলমতি রানী’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে।
বইটির তথ্য অনুযায়ী, ফুলমতির বাবার নাম অর্জুন রবিদাস এবং মা ফু রানী রবিদাস। সাদুল্লাপুর থানার জামালপুর ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর এক মেয়ে সপ্তমী এবং চার ছেলে। সাদুল্লাপুর উপজেলা শহরের উত্তরপাড়ায় ছিল তাঁর বাড়ি।
ফুলমতির স্বামী প্রয়াত কুশিরাম সরকার ফসিয়ার। স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন তিনি। ১৯৮৮ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের আগলে রেখে একাই কঠিন সংগ্রাম করেছেন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একদিন পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা ফুলমতিদের বাড়িতে যায়। তারা তাঁকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করে।
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি ফুলমতি। পরে নানা আবেদন ও প্রচেষ্টার পর ২০১৬ সালের মার্চে তিনি ‘বীরাঙ্গনা’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের প্রায় ৪৫ বছর পর তিনি এই স্বীকৃতি লাভ করেন।
২০১০ সালে ঢাকার স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের সহযোগিতায় স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য জেনেসিস ও উপজেলা সামাজিক উদ্যোক্তা দল তাঁকে সম্মাননা ও উপহার দেয়।
সাদুল্লাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ আজমী বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে ফুলমতির ত্যাগ ও নির্যাতনের ইতিহাস অত্যন্ত বেদনাদায়ক। স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন তিনি স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত ছিলেন। অনেক চেষ্টা ও আবেদনের পর ২০১৬ সালে সেই স্বীকৃতি পান।
তিনি আরও বলেন, শয্যাশায়ী অবস্থায় ফুলমতির চিকিৎসায় সরকারি পর্যায় থেকে আরও সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল। তবে তিনি বা তাঁর পরিবারের সদস্যরা কারও কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতেননি। শেষ দিন পর্যন্ত আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছেন তিনি।
ফুলমতির মৃত্যুতে স্থানীয়দের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, তাঁর নির্যাতন, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন ও মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার পাশাপাশি স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য সমাধিস্থলে স্মৃতিফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
মতামত দিন