বিজিবি-বিএসএফ সম্মেলন নিয়ে 'অনুমাননির্ভর' প্রতিবেদন, বিজিবির প্রতিবাদ
৫৭তম বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এক বিজ্ঞপ্তিতে রোববার মধ্যরাতে এ প্রতিবাদ জানায় বাহিনীটি। 'দুই দেশের বিবৃতিতে রহস্যময় ফারাক' শীর্ষক ওই প্রতিবেদনকে 'অনুমাননির্ভর ও তথ্যগতভাবে ভুল' বলে উল্লেখ করেছে বিজিবি।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, যৌথ প্রেস বিবৃতিতে 'সীমান্ত হত্যা'-র বদলে 'সীমান্তে সংঘটিত মৃত্যু' শব্দবন্ধ ব্যবহার বিজিবির অবস্থানের দুর্বলতা প্রমাণ করে। এই দাবি সরাসরি নাকচ করেছে বিজিবি। বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক দলিল জয়েন্ট রেকর্ড অব ডিসকাশনসে (জেআরডি) 'কিলিং' শব্দটিই ব্যবহৃত হয়েছে এবং বিজিবি কখনো এই অবস্থান থেকে সরে আসেনি। বিজিবির বক্তব্য, কোনো সম্মেলনের প্রকৃত অবস্থান নির্ধারণে সংক্ষিপ্ত প্রেস বিবৃতি নয়, মূল আলোচনার আনুষ্ঠানিক নথিই প্রামাণিক দলিল।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছিল, যৌথ বিবৃতিতে পুশ-ইন ও সীমান্ত হত্যার বিষয় না থাকায় এগুলো বৈঠকে গুরুত্ব পায়নি। এই দাবিও নাকচ করেছে বিজিবি। বাহিনীর প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, বিজিবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পুশ-ইন, সীমান্ত হত্যা, আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে অবৈধ অবকাঠামো নির্মাণ, মাদক চোরাচালান এবং পার্বত্য অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রমসহ বাংলাদেশের সব উদ্বেগ বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। বিষয়গুলো শুধু আলোচিতই হয়নি, জেআরডিতে আনুষ্ঠানিকভাবে নথিবদ্ধও হয়েছে।
যৌথ বিবৃতি ও বিজিবির পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির পার্থক্যকে প্রতিবেদনে 'রহস্যময়' বলা হয়েছিল। বিজিবি বলছে, এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। আয়োজক পক্ষ সংক্ষিপ্ত যৌথ বিবৃতি দেয়, আর অংশগ্রহণকারী দেশ নিজস্ব জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আলাদাভাবে বিস্তারিত তুলে ধরে — এটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চর্চার স্বাভাবিক অংশ।
প্রতিবেদনে বিভিন্ন সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে, বিজিবি প্রতিনিধিদল 'বিএসএফের কাছে আত্মসমর্পণ' করেছে এবং 'আপোসকামী অবস্থান' নিয়েছে। বিজিবি বলছে, এত গুরুতর অভিযোগের পক্ষে একটিও যাচাইযোগ্য প্রমাণ বা নথি উপস্থাপন করা হয়নি। সাম্প্রতিক পুশ-ইন ইস্যুতে মাঠপর্যায়ে বিজিবি যে দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছে, তার ধারাবাহিকতাই দিল্লির সম্মেলনে প্রতিফলিত হয়েছে বলে দাবি বাহিনীর।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের 'পজিশন পেপার' আগেই বিএসএফের হাতে পৌঁছে যাওয়ার বিষয়টি সংবেদনশীল ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। বিজিবি জানিয়েছে, মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকের আগে উভয় পক্ষের মধ্যে এজেন্ডা ও প্রাসঙ্গিক নথি বিনিময় একটি প্রতিষ্ঠিত রীতি। বিএসএফ গত ১৪ মে তাদের এজেন্ডা পয়েন্ট বিজিবিকে পাঠিয়েছিল, যা ১৬ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এই স্বাভাবিক আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াকে 'গোপন তথ্য ফাঁস' হিসেবে উপস্থাপন করাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলছে বিজিবি।
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে বিজিবি মহাপরিচালকের সাক্ষাৎকে প্রতিবেদনে 'গোপন বৈঠক' বলা হয়েছিল। বিজিবি জানিয়েছে, প্রতিটি সীমান্ত সম্মেলনেই আয়োজক দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে অতিথি বাহিনীর প্রধানের সৌজন্য সাক্ষাৎ একটি অনুসৃত রীতি। ঢাকায় অনুষ্ঠিত ৫৬তম সম্মেলনেও ডিজি বিএসএফ বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে একই ধরনের সাক্ষাৎ করেছিলেন। এবারের বৈঠকটি ভারতে যাওয়ার আগেই পূর্বনির্ধারিত ও অনুমোদিত ছিল এবং সেখানে সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান দৃঢ়ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিজিবি। প্রতিবেদনে উল্লিখিত কোনো চিঠি ওই বৈঠকে হস্তান্তর করা হয়নি বলেও স্পষ্ট করেছে বাহিনীটি।
প্রতিবেদনে বিজিবি মহাপরিচালকের ভারতে প্রশিক্ষণ গ্রহণের বিষয়টি উল্লেখ করে তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিজিবি এই প্রচেষ্টাকে 'অযৌক্তিক ও বিপজ্জনক' বলে অভিহিত করেছে। বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, তুরস্ক, চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন। প্রশিক্ষণের দেশ দিয়ে কোনো কর্মকর্তার আনুগত্য বিচার করার এই যুক্তি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেছে বিজিবি।
বিজিবি বলেছে, সীমান্ত নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে দায়িত্বশীল ও তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতা জাতীয় স্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে তা যাচাইকৃত তথ্য ও প্রামাণিক নথির ভিত্তিতে হতে হবে। অনুমাননির্ভর ও অজ্ঞাত সূত্রের বরাতে বাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্টের প্রচেষ্টা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার নীতির পরিপন্থি বলে মন্তব্য করে সংশ্লিষ্ট পত্রিকাকে এই প্রতিবাদলিপি প্রকাশ করে সঠিক তথ্য উপস্থাপনে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছে বিজিবি।

মতামত দিন