Views Bangladesh Logo

অনলাইন হোক আর অফলাইন হোক পাঠক অবশ্যই বেড়েছে

বারের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে লেখক ও সাংবাদিক সালাহ উদ্দিন মাহমুদের প্রবন্ধের বই ‘বাংলা সাহিত্যে শিল্পপ্রবণতা’ এবং দুটি শিশু-সাহিত্যের বই। তার মতে, এখন শিশুসাহিত্যিকরা ভূত আর পরীর মধ্যে আটকে আছেন এবং গঠনমূলক সমালোচনা সাহিত্যের জন্য খুবই জরুরি। এমন নানাবিধ বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন ভিউজ বাংলাদেশের সহ-সম্পাদক মাহফুজ সরদার

ভিউজ বাংলাদেশ: এবারের বইমেলায় আপনার কী কী বই প্রকাশিত হয়েছে এবং এ যাবৎ আপনার কতটি বই প্রকাশিত হয়েছে?
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
এবারের বইমেলায় আমার তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে। ‘বাংলা সাহিত্যে শিল্পপ্রবণতা’ নামে প্রবন্ধের বইটি প্রকাশ করেছে কিংবদন্তি পাবলিকেশন। ‘স্বাধীনতার গল্প’ নামে শিশুতোষ বইটি প্রকাশ করেছে কিডজ কারাভান। ‘ছোটদের ছয় ঋতু’ নামে প্রকৃতিবিষয়ক মুক্তগদ্য প্রকাশ করেছে দোলন পাবলিকেশন। ২০১৭ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত আমার ১৪টি বই প্রকাশিত হয়েছে।

ভিউজ বাংলাদেশ: আপনি একাধারে কবিতা ও গল্পের পাশাপাশি প্রবন্ধ রচনায় মনোযোগী হয়েছেন এর কারণ কি?
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
: আমি আসলে বাংলা সাহিত্যের সব শাখায় কাজ করার চেষ্টা করছি। আমার একাধারে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, মঞ্চনাটক, শিশুসাহিত্য, গবেষণা এবং সমালোচনা সাহিত্যে পদচারণা রয়েছে। কারণ বলতে, সব বিষয়ে লেখালেখির চেষ্টা করছি। এটি হয়তো ঐশ্বরিক ক্ষমতা হতে পারে। শুধু তা-ই নয়, আমি আবৃত্তি এবং অভিনয়ের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছি। লিখে লিখে শেখার চেষ্টা করছি।

ভিউজ বাংলাদেশ: প্রবন্ধ সাহিত্য নিয়ে আপনার কোনো ভাবনা আছে?
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
প্রবন্ধ সাহিত্য দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে। প্রযুক্তির কল্যাণে এখন অনেক তথ্য-উপাত্ত গুগল ঘাটলেই পাওয়া যায়। ফলে বেশিরভাগ প্রাবন্ধিক কয়েকজনের লেখা থেকে সহজেই তথ্য নিয়ে আরেকটি প্রবন্ধ তৈরি করে ফেলছেন। যে কারণে নতুন বিষয়ের, আঙ্গিকের প্রবন্ধ চোখে পড়ছে কম। একই বিষয়ের চর্বিত চর্বন মনে হচ্ছে। নতুন কোনো বিষয় নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, সত্যতা যাচাইয়ে সময় দিতে হয়। সেটি এখন কম হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। যেমন- হুমায়ূন আহমেদের নাটকে গৃহকর্মী চরিত্র বিষয়ে একটি প্রবন্ধ লিখতে আমাকে চল্লিশটি নাটক দেখতে হয়েছে। চরিত্রের সংলাপ, বর্ণনা বা বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করতে হয়েছে। এ বিষয়ে আগে কেউ লেখেননি বলেই পরিশ্রমটি আমাকে করতে হয়েছে। সুতরাং নতুন নতুন বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা জরুরি। সবাই সেই দিবসভিত্তিক রচনা সৃষ্টি করে যাচ্ছেন। বিভূতি, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলে আটকে আছেন। সাম্প্রতিক প্রবন্ধে তাই নতুনত্ব এবং অভিনবত্ব আনা সময়ের দাবি।

ভিউজ বাংলাদেশ: সমালোচনা কতটা জরুরি বলে আপনি মনে করেন? সমালোচনা কেমন হওয়া উচিত
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
সমালোচনা খুবই জরুরি; কিন্তু বেশিরভাগ লেখক সমালোচনা নিতে পারেন না। তেড়েফুড়ে মারতেও আসবেন- এমন অবস্থা। সবাই চাচ্ছেন, ইতিবাচক সমালোচনা হোক। অর্থাৎ লেখকের গুণগান, প্রচ্ছদের প্রশংসা। বিষয় নির্বাচন, বাক্যগঠন, বানান শুদ্ধি নিয়ে কথা বলা যাচ্ছে না। অনেকটা তেলবাজি বা স্তুতি চলছে সমালোচনা সাহিত্যে। বইয়ের বা লেখার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত না পড়েই লেখকের প্রশংসামূলক প্রবন্ধ রচিত হচ্ছে আজকাল। ফলে ভুল যদি থেকে থাকে, তা আর সংশোধন হচ্ছে না। অনেক জনপ্রিয় লেখকও সমালোচনা সহ্য করতে পারেন না। অথচ সমালোচনা হওয়া উচিত লেখকের পাথেয়। সমালোচককে সাধুবাদ জানানো উচিত। নিজের ভুলগুলো যেন অন্যের মাধ্যমে জানতে পারেন। সেই সুযোগ আর হচ্ছে না। প্রবীণ লেখকরাও নবীনদের সাহিত্য নিয়ে সমালোচনা করছেন না। তারা শুধু বলে থাকেন, এই সময়ে কিছু হচ্ছে না। তরুণরা সাহিত্য বোঝে না; কিন্তু তারা বলছেন না, কেন কিছু হচ্ছে না। তরুণদের কী করা উচিত? সমালোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে নেওয়া এবং গঠনমূলক সমালোচনা সাহিত্যের জন্য খুবই জরুরি।

ভিউজ বাংলাদেশ: বাংলা সাহিত্য এখন কেমন সময় পার করছে?
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
এটা অনেক কঠিন প্রশ্ন। বলা যায়, ভাইরাল সময় পার করছে। যে যত ভাইরাল, তার বই তত বেশি বিক্রি হচ্ছে। তাই তো নিয়মিত সাহিত্যচর্চা না করেও তিনি বই প্রকাশ করছেন। সেই বই বছর শেষে বেস্টসেলার হচ্ছে। মান এবং বিষয়ের কথা না-ই বললাম। মূলত একটি অস্থির সময় পার করছি আমরা। সারা বছর যারা সাহিত্যচর্চা করেন, তারা ভাইরাল লেখকদের স্টল ছেড়ে দিয়ে বাইরে ঘোরাঘুরি করেন। এই অস্থিরতার কারণ একটি অস্থির প্রজন্ম। তারা বই বা লেখক না চিনলেও সেলেব্রিটি চেনেন। তাদের অটোগ্রাফ এবং সেলফি পেতে হুমড়ি খেয়ে পড়েন। তবে আশার কথা হচ্ছে, এখনো যারা নিবিষ্ট পাঠক, তারা খুঁজে খুঁজে ভালো বইটিই কেনেন। অস্থির স্রোতে সবাই গা ভাসান না। এটুকুই স্বস্তির।

ভিউজ বাংলাদেশ: আপনি তো শিশু সাহিত্য রচনা করেন, বর্তমানে মানসম্পন্ন শিশুসাহিত্যিকের সংখ্যা কম-এর কারণ কি?
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
: কম কি বেশি বলা যাচ্ছে না। তবে বইমেলার শিশুচত্বরে গেলে তো প্রচুর বই পাওয়া যায়। পত্রিকার শিশুতোষ পাতায় প্রচুর লেখা ছাপা হয়। শিশুতোষ অনেক প্রকাশনীও আছে। বেচাবিক্রিও ভালো হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে বলা যায়, লেখক আছেন। তবে চর্চাটা কেমন হচ্ছে, সেটাই বিষয়। আমি মাঝে মাঝেই বলি, শিশুসাহিত্যিকরা ভূত আর পরীর মধ্যে আটকে আছেন। শিশুসাহিত্যিক যারা আছেন, তাদের আরও সময়োপযোগী হতে হবে।

ভিউজ বাংলাদেশ: এবারের বইমেলার আয়োজন নিয়ে একটা সমালোচনা তৈরি হয়েছে, এই আয়োজন কীভাবে করা দরকার বলে আপনার মনে হয়।
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
সমালোচনা অনেক রকম হতে পারে। স্টল বিন্যাস, কর্মসূচি প্রণয়ন বা ভারসাম্য রক্ষার বিষয়ে সমালোচনা হতে পারে। তবে যেহেতু বইমেলা একটি উৎসব, উৎসবে কিছু অসংগতি থাকতেই পারে। এটি প্রতি বছরই চোখে পড়ে। আয়োজকদের হয়তো অনেক ঘাটতি থাকে। বোঝার অপ্রতুলতা থাকে। ফলে নির্ভেজাল বইমেলা উপহার দেওয়া মুশকিল হয়ে পড়ে। তবে এবারের মেলায় উচ্ছৃঙ্খল তরুণদের আধিপত্য বেশি। এই প্রবণতা ভবিষ্যতের জন্য শুভ নয়। স্টলে অযথা ভিড় করা। ব্লগার এবং ইউটিউবারের পরিচয়ে অযথাই লেখক-পাঠককে হয়রানি করার প্রবণতা বাড়ছে। এসব প্রচারের ক্ষেত্রে অবশ্যই নীতিমালা থাকা উচিত। বইমেলা সবার জন্য আরামদায়ক হোক।

ভিউজ বাংলাদেশ: অনলাইন এসে পাঠকের সংখ্যা কি বেড়েছে নাকি কমেছে এর কারণ কি?
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
অনলাইন হোক, অফলাইন হোক- পাঠক অবশ্যই বেড়েছে। প্রতি বছর বইমেলায় ৪০-৫০ কোটি টাকার বই বিক্রি হচ্ছে। তবে পাঠক বৃদ্ধি জরুরি। তিনি ছাপার বই পড়ুন বা ই-বুক পড়ুন। আমার কাছে পড়াটাই জরুরি। অমি এমফিলে তিনটি কোর্সের পরীক্ষা দিয়েছি বিভিন্ন পিডিএফ এবং অনলাইন আর্টিকেল পড়ে। কারণ ওই বইগুলো সংগ্রহ করা আমার জন্য সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল ছিল। হয়তো প্রিন্টের পাঠক কমছে; কিন্তু অনলাইনের পাঠক তো বাড়ছে। এতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আমি ইদানীং ছাপার বইয়ের চেয়ে অনলাইনে লেখা বেশি পড়ি। পড়া সহজ। এক মুঠোফোনেই অনেক কিছু পাওয়া সম্ভব। ফলে এটিকে আমি ইতিবাচক ভাবেই দেখি।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ