অবশেষে নিরাপদে দেশে ফিরলেন ‘বাংলার জয়যাত্রা’র নাবিকরা
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাতের জেরে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরে কয়েকমাস অবরুদ্ধ থাকার পর নিরাপদে দেশে ফিরেছেন বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’র নাবিক ও ক্রুরা।
দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান হয়ে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সন্ধ্যায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তারা। বিমানবন্দরে নাবিকদের স্বাগত জানান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও পরিবারের সদস্যরা। এ সময় এক আবেগঘন পরিবেশ বিরাজ করে।
দেশে ফিরে এক সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা জানান জাহাজটির ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম। নিরাপদে ফেরাটাকে ‘দ্বিতীয় জীবন’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা স্বদেশে ফিরতে পেরেছি। এই দুঃসময়ে সার্বিক সমর্থন, প্রার্থনা ও খোঁজখবর রাখার জন্য দেশবাসীর প্রতি আমরা চিরকৃতজ্ঞ।”
ক্যাপ্টেন জানান, সংঘাত চলাকালে পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা বিভিন্ন দেশের নাবিকরা চরম মানসিক ট্রমার মধ্যে দিন কাটিয়েছেন। কয়েকটি জাহাজ ডুবে যাওয়ার পাশাপাশি কয়েকজন নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন বলেও খবর পাওয়া যায়। অনেক জাহাজে খাদ্য ও খাওয়ার পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। তবে ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার স্বার্থে নাবিকরা জাহাজ পরিত্যাগ করেননি। বাংলাদেশ সরকারের সঠিক সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও দিকনির্দেশনায় জাহাজটিকে সুরক্ষার পাশাপাশি নাবিকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির কথা স্মরণ করে ক্যাপ্টেন শফিকুল বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলি বন্দরে অবস্থানকালে তাদের একদম কাছের একটি বার্থে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে পাশের একটি তেলবাহী ট্যাংকারে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়। ছয়টি টাগবোট চেষ্টা করেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছিল। দূরবর্তী ওই ট্যাংকারটির ৪০টি ফুয়েল ট্যাংকের যেকোনো একটিতে বড় বিস্ফোরণ ঘটলে মুহূর্তেই ভস্মীভূত হয়ে যেতে পারত ‘বাংলার জয়যাত্রা’।
জাহাজটির তৎকালীন কম্যান্ডিং অফিসার প্রণয় কৃষ্ণ সেন জানান, সামরিক উত্তেজনার মধ্যে স্যাটেলাইটভিত্তিক নেভিগেশন ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। ফলে জিপিএসের ওপর নির্ভর না করে সম্পূর্ণ ম্যানুয়ালি নিখুঁতভাবে জাহাজ পরিচালনা করতে হয়েছে। পাশাপাশি সংঘাতপূর্ণ জলসীমায় মাইন বিছানো থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিটা পদক্ষেপ ফেলতে হয়েছে।
বিএসসি সূত্রে জানা যায়, গত ২ ফেব্রুয়ারি হরমুজ প্রণালি হয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করে ‘বাংলার জয়যাত্রা’। এরপর কাতার থেকে স্টিল কয়েল লোড করে ২৭ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলি বন্দরে নোঙর করে। কিন্তু তার পরদিনই উভয় পক্ষের হামলা ও সামরিক সংঘাত শুরু হলে অঞ্চলটিতে সব ধরনের নৌচলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয় এবং জাহাজটি সেখানে আটকা পড়ে।
দীর্ঘদিন চরম অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুঝুঁকি পার করে অবশেষে স্বদেশে ফিরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন নাবিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা।
মতামত দিন