Views Bangladesh Logo

বিশ্বকাপে কানাকড়ি হারানো বাংলাদেশ!

M. M.  Kayser

এম. এম. কায়সার

য়ে শুরু। তারপর হার, হার, হার, হার, হার, হার, জয় এবং হার! এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পারফরমেন্সের খেরোখাতা এটি। ১০ দলের মধ্যে অষ্টম। ৯ ম্যাচে সাকুল্যে জয় দুটি। মাঝে টানা ছয় ম্যাচে হার। তাও আবার পুরোপুরি ছন্নছাড়া ভঙ্গিতে। হারা ম্যাচগুলোতে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়তে পারেনি দল। প্রতি ম্যাচেই ব্যাটিং ব্যর্থতার একই গল্প। বড় স্কোরের স্বপ্ন ছড়িয়েও সেই পুরোনো ব্যর্থতার বৃত্তে আটকে দিন শেষে হেরে ফিরে আসা। শক্তিমান দলের বিরুদ্ধে ভীষণ অসহায়। ছিটেফোঁটা লড়াইও নেই। শুধু কি তাই? র‌্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে থাকা অপেক্ষাকৃত কম শক্তিমান দলের কাছেও অসহায় হার। নেদারল্যান্ডসের কাছে হেরে এই বিশ্বকাপে নিজেদের শেষ কানাকড়িও হারিয়ে ফেলে বাংলাদেশ। বড় হারের পর প্রতি ম্যাচ শেষেই একই প্রতিশ্রুতি- পরের ম্যাচে ভালো কিছুর প্রত্যাশা। আমরা ঘুরে দাঁড়াব। কিন্তু সেই ঘুরে দাঁড়ানো আর হলো না! বরং গুঁড়িয়ে গেল দল। ব্যাটে-বলে বিশ্বকাপজুড়ে বাংলাদেশের এমন পারফরমেন্সের পাশে একটাই শব্দ যুতসই- হতাশা!

বিশ্বকাপ মিশনের শেষের দিকে এসে তাই প্রতিটি সংবাদ সম্মেলনে কমন একটা প্রশ্ন ছিল- এটাই তাহলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্যর্থ সফর? দলের খেলোয়াড়, সমর্থক, দর্শক, বিশ্লেষক সবাই একবাক্যে এই কঠিন ও তেতো সত্যটা মেনে নিচ্ছেন। পরিসংখ্যান ঘেটে অনেকে হয়তো বলতে পারেন ২০০৩ বিশ্বকাপে তো বাংলাদেশ কোনো ম্যাচেই জেতেনি। এমনকি সেই দফা তো কানাডা ও কেনিয়ার মতো দলের কাছে হেরেছিল বাংলাদেশ। এবার তো অন্তত দুটি ম্যাচ জিতেছে দল। বিষয়টি হলো ২০০৩ বিশ্বকাপ ছিল বাংলাদেশের মাত্র দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। তখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশ মাত্র নতুন, নবিশ দল। সেসময় ভুলচুক হওয়াটা মেনে নেয়াই যায়; কিন্তু এখন সাত নম্বর বিশ্বকাপে খেলতে আসা বাংলাদেশ তো অনেক পরিণত একটা দল। তারচেয়ে বড় কথা এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল ওয়ানডে সুপার লিগের তিন নম্বর দল হয়ে। ১০ দলের মধ্যে বাংলাদেশ ছিল তৃতীয়। বিশ্বকাপের আগের দুই বছর ওয়ানডে ক্রিকেটে দুর্দান্ত সময় কাটিয়েছিল দল।

দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারতের মতো দলের বিরুদ্ধে দ্বিপক্ষীয় ওয়ানডে সিরিজ জিতেছে। সেই দলই যখন বিশ্বকাপের আসরে গিয়ে ১০ দলের মধ্যে অষ্টম হয়ে ফিরবে তখন প্রশ্ন উঠবেই। গলদটা কোথায়, কেন এমন হলো? প্রশ্ন একটা; কিন্তু উত্তর যে অনেক এবং উত্তরগুলো বেশ সহজ। সেই সহজ উত্তর খোঁজার জন্য বিশেষ কোনো তদন্ত কমিটির প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের খেলা ম্যাচগুলো বিশ্লেষণ করলেই মোটাদাগে ব্যর্থতার উত্তরগুলো পেয়ে যাবেন। সেই সমীকরণ মেলাই। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে আছে ব্যাটিং। গোটা বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দল যে ব্যাটিং করেছে তা দিয়ে কোনো মতে দিন আনি দিন খাই টাইপ। এই সঞ্চয়ে কোনো সমৃদ্ধি হয় না। অভাব নিত্যদিন লেগেই থাকে।

হাফসেঞ্চুরি পাওয়ার পরই ব্যাটসম্যানরা যেন অনেককিছু হয়ে গেছে- এই আয়েশে তৃপ্ত হয়ে পড়েন। ব্যক্তিগত ইনিংস বড় করার সুযোগ ছিল; কিন্তু সেই সুযোগটা কাজে লাগাতে ব্যর্থ খেলোয়াড়রা। আর তাই দলীয় ইনিংসও সমৃদ্ধ হলো না। ৯ ম্যাচে মাত্র একবার বাংলাদেশ তিনশ রান করেছে। অথচ এই সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল আরও বেশ কয়েকটি ম্যাচে; কিন্তু শুধু সুযোগ পেলে তো হবে না, সেই সম্ভাবনাকে কাজে তো লাগাতে হবে। এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দল ২৫০ রানের মধ্যেই সন্তুষ্টি খুঁজেছে। অথচ পুরোদস্তুর ব্যাটিং সহায়ক উইকেটে এবারের বিশ্বকাপে সাড়ে তিনশ রানও নিরাপদ কোনো সংগ্রহ ছিল না। প্রায় প্রতিটি দল যেখানে হর হামেশা সাড়ে তিনশ এমনকি চারশ রানও তুলছে তুল্যমুল্যের সেই নিক্তিতে বাংলাদেশ দল ছিল অনেক পিছিয়ে।

পরিসংখ্যান জানাচ্ছে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচ প্রতি রান গড় ২২৮। এই সময়ের ক্রিকেটে কোনো দল কি এত কম সংগ্রহ নিয়ে ম্যাচ জিততে পারে? পারে না। বাংলাদেশও তাই পারেনি। সেমিফাইনালের আগ পর্যন্ত বিশ্বকাপে সেঞ্চুরির সংখ্যা ৩৫টি। মুড়ি মুড়কির মতো সেঞ্চুরি হয়েছে। অথচ এই তালিকায় বাংলাদেশের হয়ে সেঞ্চুরি করেছেন মাত্র একজন। মুম্বাইয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের সেই সেঞ্চুরি যখন হয়েছে তখন দলের হার যে প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছে। দলের সাফল্যে যদি কাজেই না আসে তাহলে সেই সেঞ্চুরি তো অর্থহীনই বটে! অতিরিক্ত পরিমাণ ডটবল খেলে ব্যাটসম্যানরা নিজেদের কাজ আরও কঠিন করে তোলেন।

এক ম্যাচে তো বাংলাদেশ ৫০ ওভারের মধ্যে প্রায় ২৬ ওভারই ডটবল খেলে! বিশ্বকাপজুড়ে বাংলাদেশ ব্যাটিং নিয়ে লাগাতার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছে। ব্যাটিং অর্ডার নিয়ে টিম ম্যানেজমেন্টের এই পরীক্ষা-নিরীক্ষায় পুরো বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ব্যাটিং ডিসঅর্ডার হয়ে যায়। প্রতি ম্যাচে এমন ব্যাটিং অর্ডারের এই অদল-বদলের কারণে ব্যাটসম্যানদের আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরে। তারা ধরে নেন, তারা যে জায়গায় ব্যাটিং করছেন সেটা নিয়ে টিম ম্যানেজমেন্ট আশ্বস্ত নয়। তাই বারবার এই পরিবর্তন হচ্ছে। এই অদল বদল নিয়ে তারা বিরক্ত এবং নাখোশ হলেও দলের সিদ্ধান্ত মেনে নেন। বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত স্বীকার করে নেন- ‘এটা যদি (ব্যাটিং অর্ডার অদল-বদল) আমাদের না করতে হতো তাহলে ভালো হতো। এই বিশ্বকাপে আমরা এটা অনেক বেশি করেছি। ভালো হতো এটা যদি আমরা আরো কম করতে পারতাম এবং সেরা হতো যদি এটা একেবারেই না করতে হতো।’ এতেই পরিষ্কার যে বিশ্বকাপজুড়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং অর্ডারের এমন ব্যাপক হারে অদল-বদল স্বস্থির এবং ‘পরিষ্কার’ কোনো চিন্তা ছিল না। আর তাই পুরো বিশ্বকাপেই বাংলাদেশের ব্যাটিংকে আপনি এক কথায় বলতে পারেন- অপরিচ্ছন্ন ব্যাটিং!

বিশ্বকাপজুড়ে বোলিংয়ে ও ছন্নছাড়া সময় কাটিয়েছে বাংলাদেশ। পেসার-স্পিনার কোনো বিভাগ থেকেই দাপুটে কোনো পারফরম্যান্স নেই। এমনই শোচনীয় অবস্থা যে দলের প্রাইম বোলারকেও মাঝপথে একাদশ থেকে বাদ দিতে হয়েছে। ম্যাচ পরিস্থিতি অনুযায়ী বোলাররা বোলিং করতে পারেননি। উইকেট থেকে বোলিংয়ে যখন বাড়তি কোনো সুবিধা মিলবে না তখন পরিকল্পনা বা কৌশলে বদল আনতে হয়; কিন্তু বদল আয়ত্ত করতে পারেননি বোলাররা। মুখস্ত বিদ্যার কৌশলে একটা দুটো পরীক্ষা উতরানো যায়; কিন্তু কঠিন পরীক্ষায় তাতে পাস মার্ক মিলে না। বিশ্বকাপজুড়ে সেই সংকটে পড়া বাংলাদেশের বোলিং লাইনআপ ডাঁহা ফেল! টানা বড় হারে পর্যুদস্ত হয়ে পড়া বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমও হয়ে যায় সব হারানো দলে। মাঠে খেলোয়াড়দের শারীরিক ভাষা, হাঁটাচলা, সংবাদ সম্মেলনে কথাবার্তা-সবকিছুতে একটা সর্বস্ব হারানোর সুর।

মানসিকভাবে নেতিয়েপড়া দলকে চাঙ্গা করতে ব্যর্থ দলের একগাদা কোচিং প্যানেল। সমস্যা থাকবেই; কিন্তু সেই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় তো খুঁজে বের করতে হবে। বিশ্বকাপে সেই সমাধানের চেষ্টা যে করা হচ্ছে তার কোনো লক্ষণই যে পাওয়া গেল না! বিশ্বকাপে ব্যর্থ মিশন শেষে দল ফিরে এসেছে; কিন্তু দলের বা টিম ম্যানেজমেন্টের কেউ এই ব্যর্থতার জন্য অন্তত সামান্য দুঃখপ্রকাশ পর্যন্ত করলেন না। বুকভরা একরাশ আবেগ উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ভালোবাসা নিয়ে পুরো দেশের মানুষ ক্রিকেট দলকে সমর্থন দিয়েছিল। একটা সামান্য বাউন্ডারি শটের অর্জনে কি বিপুল আনন্দেই না মানুষ হাততালি দিচ্ছে! একটা ছোট্ট ফিল্ডিং কৃতিত্বকে অসামান্য মর্যাদায় আপ্লুত করছে। এই পাগলপারা সমর্থকরা আশায় ছিলেন বাংলাদেশ দল মাঠে অন্তত লড়াইটুকু করবে; কিন্তু ৯ ম্যাচের মধ্যে যে সাতটিতে বাংলাদেশ হেরেছে তাতে যে লড়াইয়ের ছিঁটেফোঁটাও নেই।

অসহায় আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে হারা এই ম্যাচগুলো বাংলাদেশের ক্রিকেট মর্যাদায় কালো দাগ। এই বিশ্বকাপ থেকে আফগানিস্তান, নেদারল্যান্ডসও আগেভাগে বিদায় নিয়েছে; কিন্তু এই দুটি দল বিশ্বকাপজুড়ে যে ক্রিকেট খেলেছে তাতে এই টুর্নামেন্ট থেকে একটা নতুন স্বীকৃতি নিয়ে ফিরে গেছে তারা। যুক্তির খাতিরে আপনি হয়তো বলতে পারেন, ইংল্যান্ড তো এবার চরম বাজে পারফরমেন্স করেছে। তাহলে শুধু বাংলাদেশকে কেন দোষী মানছেন? উত্তর হলো- ইংল্যান্ড এবার চরম খারাপ করেছে; কিন্তু এই দলটাই তো গেলবারের চ্যাম্পিয়ন। তারা এবার ব্যর্থ; কিন্তু চারবছর আগে তো তারা চ্যাম্পিয়নও হয়েছিল; কিন্তু বাংলাদেশ? সাতটি বিশ্বকাপ খেলা হয়ে গেল। আর্ন্তজাতিক ওয়ানডে ক্রিকেটে ৩৭ বছরেও বাংলাদেশের কাছে বিশ্বমঞ্চের কোনো ট্রফি নেই। আর এবার ১০ দলের মধ্যে আট নম্বর হওয়া বাংলাদেশের ক্রিকেট সক্ষমতা, দক্ষতা এবং যোগ্যতার পিঠে শক্ত পেরেক ঠোকা হয়ে গেল!

লেখক: সম্পাদক, স্পোর্টস বাংলা

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ