অক্সফোর্ড গবেষণা
২০৫০ সালে বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ ৬ দেশের একটি হবে বাংলাদেশ
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের যে ছয়টি দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তার মধ্যে অন্যতম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে পরিচালিত এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।
নেচার সাসটেইনেবিলিটি সাময়িাকীতে সোমবার প্রকাশিত এই গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও ফিলিপাইন চরম তাপপ্রবাহের কারণে মারাত্মক সংকটের মুখে পড়বে। বিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহের এই সংকট দ্রুত ঘনীভূত হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, জনস্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর। বর্তমান হারে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার অব্যাহত থাকলে আগামী ২৫ বছরের মধ্যে প্রচণ্ড তাপের সংস্পর্শে আসা মানুষের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে।
গবেষণার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যদি শিল্প-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, তবে চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ বিশ্বের প্রায় ৪১ শতাংশ অর্থাৎ ৩৭৯ কোটি মানুষ চরম তাপমাত্রার মধ্যে জীবনযাপন করবে। ২০১০ সালে এই হার ছিল মাত্র ২৩ শতাংশ বা ১৫৪ কোটি। গবেষকরা এই ঝুঁকি নিরূপণে ‘কুলিং ডিগ্রি ডেইজ’ বা সিডিডি সূচক ব্যবহার করেছেন, যা দিয়ে বোঝা যায় কোনো নির্দিষ্ট স্থানে ঘরের তাপমাত্রা নিরাপদ রাখতে বছরে ঠিক কতটা শীতলীকরণের প্রয়োজন পড়ে।
গবেষণায় বছরে ৩ হাজার সিডিডির বেশি প্রয়োজন এমন অঞ্চলগুলোকে ‘চরম তাপপ্রবণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অক্সফোর্ডের গবেষক ড. জেসুস লিজানা সতর্ক করে বলেছেন, বাংলাদেশের জাতীয় গড় তাপমাত্রা দিয়ে প্রকৃত ঝুঁকি বোঝা সম্ভব নয়। কারণ এ দেশের অধিকাংশ মানুষ এমন সব জনবহুল এলাকায় বাস করে যেখানে শীতলীকরণের চাহিদা বছরে ৩ হাজার সিডিডির অনেক বেশি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই চরম তাপমাত্রা একটি নতুন ও নীরব ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বলতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যাকে বোঝানো হলেও এখন প্রবল তাপপ্রবাহ সমানভাবে প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।
চিকিৎসকদের মতে, এই তাপপ্রবাহের ফলে মানুষের মধ্যে হিটস্ট্রোক, হৃদরোগের জটিলতা এবং কিডনি রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং স্বল্প আয়ের শ্রমজীবী মানুষ—যাদের পর্যাপ্ত শীতলীকরণ বা এসি ব্যবহারের সুযোগ নেই—তারা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। এর ফলে মানুষের কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতাও ব্যাপকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, উষ্ণ ও উপ-উষ্ণ অঞ্চলের নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে শীতলীকরণের চাহিদা ভবিষ্যতে সবচেয়ে দ্রুত বাড়বে। বিপরীতে, উত্তরের উন্নত দেশগুলোতে শীতের তীব্রতা কমে আসায় ঘর উষ্ণ রাখার প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পাবে।
গবেষকরা একটি বিশেষ ‘কুলিং ট্র্যাপ’ বা শীতলীকরণ চক্রের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। অতিরিক্ত গরমে এয়ার কন্ডিশনারের চাহিদা বাড়লে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়বে, আর সেই বিদ্যুৎ যদি জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে উৎপাদন করা হয়, তবে তা কার্বন নিঃসরণ বাড়িয়ে পৃথিবীকে আরও উত্তপ্ত করবে। এই চক্র ভাঙতে না পারলে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
বিজ্ঞানীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে পারলে এই ঝুঁকি অনেকটা কমানো সম্ভব। এজন্য দ্রুত কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং শহর ও আবাসন নকশায় তাপ-সহনশীল প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে