পোশাকের বাইরে নিউজিল্যান্ডে ওষুধ ও আইটি পণ্যের বাজার চায় বাংলাদেশ
নিউজিল্যান্ডের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি এখনো মূলত তৈরি পোশাকনির্ভর। এই নির্ভরতা কমিয়ে ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, পাট, চামড়া ও টেকসই বস্ত্রসহ অ-পোশাক পণ্যের রফতানি বাড়াতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি কৃষি-প্রযুক্তি, দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ, সবুজ জ্বালানি ও কোল্ড-চেইন খাতে নিউজিল্যান্ডের বিনিয়োগ আকর্ষণেরও চেষ্টা চলছে।
এ লক্ষ্যে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের সরাসরি যোগাযোগ, ভার্চুয়াল ব্যবসায়িক বৈঠক এবং সরকারি পর্যায়ে সমন্বয় বাড়াতে তিনটি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ব্যবসায়িক কাউন্সিল গঠন ও বাণিজ্য মেলা আয়োজনের বিষয়েও উভয় পক্ষ একমত হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. কামাল হোসেন এ তথ্য জানিয়েছেন। নিউজিল্যান্ড ট্রেড অ্যান্ড এন্টারপ্রাইজের (এনজেডটিই) সঙ্গে এক বৈঠকে এসব প্রস্তাব দেওয়া হয়। বৈঠকে এনজেডটিই-এর মার্কেট ম্যানেজার (দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়া) র্যাচেল ম্যাকগাকিয়ানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাব্য ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান।
বৈঠকে জানানো হয়, বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে বর্তমানে বছরে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য হয়। এর মধ্যে নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশের রফতানি প্রায় ১৪৭ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের রফতানির বড় অংশই তৈরি পোশাক। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ড থেকে বাংলাদেশ মূলত দুগ্ধজাত ও ধাতব পণ্য আমদানি করে।
এই পরিস্থিতিতে বাণিজ্যকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমুখী করতে অ-পোশাক পণ্যের রফতানি বাড়াতে চায় বাংলাদেশ। বিশেষ করে ওষুধ, পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত পণ্য, টেকসই বস্ত্র ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য নিউজিল্যান্ডের বাজারে নতুন সুযোগ তৈরিতে এনজেডটিই-এর সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
ওষুধ ও ভ্যাকসিন রফতানিতে আগ্রহ
বৈঠকে বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের উৎপাদন সক্ষমতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মান ও সনদ অনুসরণ করে উৎপাদন করছে। ফলে নিউজিল্যান্ডের বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে জেনেরিক ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহের সুযোগ রয়েছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশটির স্বাস্থ্য ও ওষুধের বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশ বাড়ানোর আগ্রহ জানানো হয়।
আইটি খাতেও বাজার খুঁজছে বাংলাদেশ
তথ্যপ্রযুক্তি খাতকেও সম্ভাবনাময় রফতানি ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বৈঠকে জানানো হয়, বাংলাদেশে ৬ লাখ ৫০ হাজারের বেশি প্রযুক্তি পেশাজীবী রয়েছেন। এই জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিউজিল্যান্ডের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সফটওয়্যার, আর্থিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবা খাতে ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
শুধু রফতানি নয়, বাংলাদেশে নিউজিল্যান্ডের বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিশেষায়িত পুষ্টিপণ্য, কোল্ড-চেইন লজিস্টিকস, কৃষি-প্রযুক্তি, উন্নত উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি খাতে নিউজিল্যান্ডের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য থাকা সুযোগ-সুবিধার কথাও বৈঠকে তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, নিউজিল্যান্ডের প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে উৎপাদন ও বিনিয়োগের মাধ্যমে শুধু স্থানীয় বাজার নয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তর বাজারেও ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ নিতে পারে।
আলোচনাকে বাস্তব ব্যবসায়িক উদ্যোগে রূপ দিতে তিনটি পদক্ষেপ দ্রুত নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। প্রথমত, এনজেডটিই-এর দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়া দলের সঙ্গে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি ও চামড়া খাতের রফতানিকারকদের সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের সম্ভাব্য ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের ভার্চুয়াল ব্যবসায়িক বৈঠকের আয়োজন। তৃতীয়ত, নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতায় প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ জোরদার করা।
এ ছাড়া দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে একটি দ্বিপক্ষীয় ব্যবসায়িক কাউন্সিল গঠনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। বাণিজ্য মেলা আয়োজন এবং একে অপরের দেশে অনুষ্ঠিত মেলায় অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়েও উভয় পক্ষ একমত হয়েছে।
বৈঠকে বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা ও বড় বাজারের সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের প্রযুক্তি, কৃষি ও উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনের দক্ষতাকে যুক্ত করে পারস্পরিক লাভজনক অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মতামত দিন