দুটি সাবমেরিন ক্যাবলের ভরসায় বাংলাদেশ, নতুন যুক্ত হলে ইন্টারনেটের দাম কমবে ৫০ শতাংশ
প্রতিবেশী দেশগুলো যখন একে একে দুই অঙ্কের সংখ্যক আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের ভরসা এখনো মূলত দুটি সরকারি সাবমেরিন ক্যাবল—সি-মি-উই-৪ ও সি-মি-উই-৫। ভারতের ১৯টি, মালয়েশিয়ার ২৩টি, থাইল্যান্ডের ১২টি ও ফিলিপাইনের ১৯টি আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ থাকলেও বাংলাদেশ আটকে আছে মাত্র দুটিতে। এই সীমিত সক্ষমতা আর ক্রমবর্ধমান চাহিদার ফারাক নিয়েই বেড়েছে উদ্বেগ, নতুন সংযোগ সময়মতো যুক্ত করা না গেলে আগামী দশকে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি বড় বাধার মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করেন নতুন সাবমেরিন ক্যাবল এলে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ২০-৩০ শতাংশ বাড়বে। এতে ইন্টারনেটের দাম কমতে পারে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত।
সোমবার ঢাকার অদূরে একটি রিসোর্টে ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ভবিষ্যৎ ব্যান্ডউইথ চাহিদা পূরণে নতুন সাবমেরিন ক্যাবলের প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক এক কর্মশালায় এসব তথ্য উঠে আসে। টেলিকম ও টেকনোলজি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত এই কর্মশালায় সংগঠনের সভাপতি মাসুদুজ্জামান রবিনের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসাইন। এ ছাড়া সিডিনেট কমিউনিকেশনস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মশিউর রহমান ও মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রজেক্ট লিড মাহমুদ শাহেদ পৃথক দুটি উপস্থাপনায় সাবমেরিন ক্যাবলের ইতিহাস, বাংলাদেশে আরও সাবমেরিন ক্যাবলের প্রয়োজনীয়তা, বিনিয়োগ ও ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়গুলো তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ জুনায়েদ ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল হাকিমসহ অন্যান্যরা।
কর্মশালায় জানানো হয়, গত এক দশকে দেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ব্যবহার বেড়েছে নজিরবিহীন হারে। ২০১৩ সালে ব্যবহার ছিল মাত্র ৫০ জিবিপিএস, যা ২০১৮ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ০.৭৬ টেরাবিটে, ২০২০ সালে ১.৭৮ টেরাবিট, ২০২২ সালে ৪.২ টেরাবিট, ২০২৪ সালে ৬.৮৬ টেরাবিট এবং ২০২৬ সালে প্রায় ১৩.৫ টেরাবিটে পৌঁছেছে—অর্থাৎ ১৩ বছরে ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ২৬০ গুণ। পূর্বাভাস বলছে, এই প্রবণতা আরও তীব্র হবে। বর্তমান চাহিদা প্রায় ১৩.৫ টেরাবিট হলেও ২০২৭ সালে তা ১৯.১ টেরাবিট, ২০২৮ সালে প্রায় ২৭ টেরাবিট, ২০৩০ সালে ৫৪ টেরাবিট, ২০৩৫ সালে ৩০৫ টেরাবিট এবং ২০৩৬ সাল নাগাদ ৪৩২ টেরাবিটে পৌঁছাতে পারে। ভিডিও স্ট্রিমিং, ক্লাউড সেবা, ডেটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং শিল্পখাতের ডিজিটালাইজেশনের কারণে এই চাহিদা আরও বাড়তে পারে বলে কর্মশালায় জানানো হয়।
বর্তমানে দেশের সি-মি-উই-৪ ও সি-মি-উই-৫ ক্যাবলের সক্ষমতা যথাক্রমে ৪.৬ ও ২.৫ টেরাবিট, বাকি ব্যান্ডউইথ আমদানি করা হয় আন্তর্জাতিক টেরেস্ট্রিয়াল ক্যাবলের (আইটিসি) মাধ্যমে। দুটি মাত্র সাবমেরিন ক্যাবলের ওপর এই অতিরিক্ত নির্ভরতাই বাড়াচ্ছে ঝুঁকি—কোনো একটি ক্যাবলে ত্রুটি বা রক্ষণাবেক্ষণজনিত সমস্যা দেখা দিলে জাতীয় পর্যায়ে ইন্টারনেট সেবায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। সরকারের তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল সি-মি-উই-৬ চালু হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে যথেষ্ট হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা, কারণ সি-মি-উই-৪-এর কার্যকাল শেষ হওয়ার কথা ২০৩০ সালে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৮ সাল নাগাদ ব্যান্ডউইথ ঘাটতি প্রায় ২০ টেরাবিটে পৌঁছাতে পারে।
এই বাস্তবতায় বেসরকারি খাতে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের অনুমোদনকে গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। প্রস্তাবিত ক্যাবলগুলো চালু হলে প্রায় ৫১ টেরাবিট অতিরিক্ত সক্ষমতা যুক্ত হয়ে মোট সক্ষমতা পৌঁছাতে পারে প্রায় ৬৭ টেরাবিটে। এতে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে, ভারত থেকে ব্যান্ডউইথ আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং পাইকারি ব্যান্ডউইথের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন তারা।
মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম বলেন, প্রাইভেট সাবমেরিন ক্যাবলে সংযুক্ত হলে দেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত হবে, ইন্টারনেটের দাম কমতে পারে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত, সেবার মান (কোয়ালিটি অব সার্ভিস) বাড়বে ২৫-৩০ শতাংশ এবং ল্যাটেন্সি বা বিলম্ব কমবে।
তিনি আরও বলেন, নতুন সাবমেরিন ক্যাবল এলে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ২০-৩০ শতাংশ বাড়বে। তার ভাষায়, এই খাতের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা আসলে সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানিগুলোর মধ্যে নয়, বরং সাবমেরিন ক্যাবল ও আইটিসির (ইন্টারন্যাশনাল টেরেস্ট্রিয়াল ক্যাবল) মধ্যে।
মতামত দিন