মাদক পাচার রোধে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সমঝোতা স্মারক
মাদকদ্রব্য ও সাইকোট্রপিক উপাদানের অপব্যবহার এবং পাচার রোধে একজোট হয়েছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। শুক্রবার রাজধানী ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এই সমঝোতা স্মারকের আওতায় উভয় দেশ মাদক পাচার এবং মাদক-সংক্রান্ত অর্থ পাচার রোধে তথ্য আদান-প্রদান করবে ও একে অপরকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেবে।
এ ছাড়া মাদক-সংক্রান্ত অপরাধে জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তি, পাচারকারী সংস্থা এবং পাচারের নতুন পদ্ধতি ও রুট সম্পর্কে নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করবে দুই দেশ।
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন রাজা নাকভি নিজ নিজ দেশের পক্ষে এই সমঝোতা স্মারকে সই করেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্বাক্ষরের দিন থেকে ১০ বছরের জন্য এই চুক্তি কার্যকর থাকবে এবং পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে পরে এর মেয়াদ বাড়ানো যাবে।
এর আগে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে সন্ত্রাসবাদ, মাদক পাচার, চোরাচালান এবং দলিলপত্র জালিয়াতি রোধে একটি খসড়া চুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছিল, যা নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ওই সিদ্ধান্তের আলোকে বর্তমান সরকার খসড়াটি পর্যালোচনা করে। তার ভিত্তিতে মাদক পাচার রোধে দুই দেশের মধ্যে এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলো।
সমঝোতা স্মারকে যা আছে
তথ্য আদান-প্রদান: মাদক পাচারকারী ব্যক্তি, অপরাধী সংগঠন এবং মাদক লুকানোর নতুন পদ্ধতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য বিনিময়।
যৌথ কার্যক্রম: মাদক পাচার রোধে উভয় দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পারস্পরিক অনুরোধে গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা এবং 'কন্ট্রোলড ডেলিভারি অপারেশন'-এর মতো সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করবে।
প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধি: মাদক নিয়ন্ত্রণ-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল বিনিময়।
প্রযুক্তিগত সহায়তা: লুকানো মাদক শনাক্ত করতে প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম এবং স্নিফার ডগ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা বিনিময়।
ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ: নিয়মিত ও অপারেশনাল তথ্য বিনিময়ের জন্য বাংলাদেশের পক্ষে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং পাকিস্তানের পক্ষে এএনএফ ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে কাজ করবে।
গোপনীয়তা রক্ষা: বিনিময় করা সব তথ্য ও নথিপত্রের কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখা হবে এবং তৃতীয় কোনো পক্ষকে তা জানানো হবে না।
আরেক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পাশাপাশি দুই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে বৈঠকও হয়েছে।
দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়, বিশেষ করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে 'অত্যন্ত সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে' বিস্তারিত আলোচনা হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশে বন্দি তিনজন পাকিস্তানির মুক্তির বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতের জন্য পাঠানো নথির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কেও বৈঠকে আলোচনা হয়।
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এ বিষয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে গঠনমূলক আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা বাড়াতে পাকিস্তান ভূমিকা রাখতে পারে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, উভয় দেশের মন্ত্রী আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অভিন্ন স্বার্থের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয় ও বিচারিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে একমত পোষণ করেন।
মানব পাচার এবং অভিবাসীদের অবৈধ চোরাচালান প্রতিরোধে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং পাচারকারী চক্র দমনে যৌথ প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ ছাড়া পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচি বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয়।
ফৌজদারি অপরাধের তদন্তে দ্রুত তথ্য ও সাক্ষ্য বিনিময়ের লক্ষ্যে 'মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ইন ক্রিমিনাল ম্যাটারস' চুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরে বৈঠকে আশা প্রকাশ করা হয় যে, এর ফলে আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় হবে।
এ ছাড়া অপরাধীরা যাতে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পালিয়ে বিচার এড়াতে না পারে, সে জন্য সন্ত্রাসবাদ ও আর্থিক অপরাধসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকর প্রত্যর্পণ ব্যবস্থা নিয়েও কথা হয় বৈঠকে।
এসব সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে উভয় পক্ষ আশা প্রকাশ করে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে