Views Bangladesh Logo

মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কায় নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখল বাংলাদেশ ব্যাংক

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত মেনে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ত্রৈমাসিকভিত্তিক মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অক্টোবরের প্রথম প্রান্তিকের (অক্টোবর-ডিসেম্বর) জন্য ঘোষিত এই মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এটিকে ‘সংকোচনমূলক’ মুদ্রানীতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন শুরু হওয়ায় মূল্যস্ফীতি বাড়ার যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা সামাল দিতেই এ সতর্ক অবস্থান নেওয়া হয়েছে। তবে একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা করতে ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে বিশেষ জোর দেওয়ার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।

বুধবার (৩০ সেপ্টম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের সভাকক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন এই মুদ্রানীতি প্রকাশ করেন ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান। অনুষ্ঠানে ডেপুটি গভর্নর সারোয়ার হোসেন, আনিছুর রহমানসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তবে সচরাচর গভর্নর উপস্থিত থেকে মুদ্রানীতি ঘোষণার নিয়ম থাকলেও এবার গভর্নর মোস্তাকুর রহমান উপস্থিত ছিলেন না।

সংবাদ সম্মেলনে ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘মগ্রিক মূল্যস্ফীতি গত জুনের ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে কমে আগস্টে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে। গত ১০ মাসের মধ্যে যা সর্বনিম্ন। এটি মূলত ৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশে নেমে আসা খাদ্য মূল্যস্ফীতির প্রতিফলন। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনও ৯ দশমিক ৩২ শতাংশের উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমতে পারে। তবে এই কমার গতি অনেকটা অনিশ্চিত। এক্ষেত্রে প্রধান ঝুঁকিগুলো হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্নতা, বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ কঠোর বৈশ্বিক মুদ্রানীতি, অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, রাজস্ব খাতের চাপ, জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা। যথাযথ সময়ের আগে মুদ্রানীতি শিথিল করলে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বাড়তে পারে। যে কারণে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।’

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নীতি সুদহার বাড়ানো হলেও বাংলাদেশে কেন বাড়েনি—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ড. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের সুদহার এমনিতেই অনেক বেশি। এর আগে অন্য দেশ কমালেও আমাদের অপরিবর্তিত ছিল। যে কারণে আপাতত কোনো পরিবর্তন আনা হচ্ছে না।’

এর আগে গত জুলাই মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধান নীতি সুদহার রেপোতে ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে সাড় ৯ শতাংশে নির্ধারণ করে। তার আগে ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে রেপোর সুদ ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত ছিল। এছাড়া আন্তঃব্যাংক ধারের সর্বোচ্চ সীমা বা স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) রেট ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ১১ শতাংশ করা হয় এবং সর্বনিম্ন সীমা স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) সাড় ৭ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়। মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বিদ্যমান থাকায় মূলত নীতি সুদহারে এ স্থিতাবস্থা বজায় রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নিয়ে ডেপুটি গভর্নর বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থনীতি দ্রুত পুনরুদ্ধারের পরিবর্তে ধীরগতির পুনরুদ্ধার হবে বলে মনে করছে। বিশ্বব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে এবং আইএমএফ তাদের আগের ৪ দশমিক ৩ শতাংশের পূর্বাভাস সংশোধন করে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে।’

দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বর্তমানে চাপে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মন্থর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করা গেছে। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে সামান্য পুনরুদ্ধার দেখা গেছে। উচ্চ অর্থায়ন ব্যয়, জ্বালানি ঘাটতি, অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা এবং অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চাহিদা ঘিরে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা প্রবৃদ্ধির গতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।’

তবে অর্থনৈতিক চাপের মাঝেও বৈদেশিক খাতের সুসংবাদ ও সরকারের বিশেষ উদ্যোগের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে হাবিবুর রহমান বলেন, ‘স্বস্তির বিষয় হলো রেমিট্যান্সপ্রবাহ ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশ বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে। আর বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা পুনরায় চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা এবং কৃষি, সিএমএসএমই ও রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য আরও ৪০ কোটি টাকাসহ মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই প্যাকেজ ঘোষণা মানে কালই সব ঋণ বিতরণ হয়ে যাবে তেমনটি নয়। এসব ঋণ যথাযথভাবে বিতরণের জন্য শিগগির একটি বাস্তবভিত্তিক বিস্তারিত কর্মসূচি দেওয়া হবে।’

ভবিষ্যৎ পথচলা প্রসঙ্গে ডেপুটি গভর্নর স্পষ্ট করেন, ‘মূল্যস্ফীতি কমার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত না করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা প্রদান করা হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান চ্যালেঞ্জ। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখবে। তথ্য-উপাত্তভিত্তিক কৌশল অনুসরণ করা হবে। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ঋণসহায়তা, কাঠামোগত সংস্কার, আর্থিক খাতের শক্তিশালীকরণ এবং সুশৃঙ্খলভাবে বিনিময় হারের নমনীয়তা বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সামগ্রিক লক্ষ্য হলো–মূল্য স্থিতিশীলতা, বাহ্যিক খাতের ভারসাম্য এবং আর্থিকব্যবস্থার দৃঢ়তা বজায় রেখে টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়তা করা।’

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ