Views Bangladesh Logo

অস্ত্র থেকে গিটার: ‘পপসম্রাট’ আজম খানের অমর গাথা

একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা, গেরিলা যোদ্ধা, সেকশন কমান্ডার—আবার ‘পপসম্রাট’। আজম খান ছিলেন এই দুই সত্তার এক অনন্য মিশেল। মুক্তিযুদ্ধে তিনি অস্ত্র হাতে লড়েছেন, আর স্বাধীন বাংলাদেশে হয়ে উঠেছেন বাংলা পপ সংগীতের প্রতিষ্ঠাতা-গুরু।

আজ ৫ জুন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সংগীত-কিংবদন্তির মৃত্যুবার্ষিকী; ২০১১ সালের এই দিনে তিনি পৃথিবী ছেড়ে যান। তার গান আর ত্যাগের উত্তরাধিকার আজ গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করা হচ্ছে। বাংলা পপ সংগীতের ইতিহাসে তিনি অবিসংবাদিত; তবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার পরিচয় শিল্পীসত্তাকেও ছাপিয়ে যায়।

অস্ত্র হাতে লড়া শিল্পী
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আজম খানের অংশগ্রহণ ছিল গভীর ও বীরত্বপূর্ণ। মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ডাকে সাড়া দিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে সেকশন কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন; ঢাকার আশপাশে গেরিলা অভিযান পরিচালনা ছিল তার অন্যতম কাজ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে তিনি বীরত্বের সঙ্গে লড়েছেন এবং একাধিক দুঃসাহসিক অভিযান চালিয়ে শত্রুশিবিরে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা আজম খানের চরিত্রে গভীর ছাপ ফেলে, যা পরে তার গানে প্রতিফলিত হয়। যুদ্ধ, দারিদ্র্য আর বঞ্চনার বাস্তবতা তাঁর গানকে করেছিল ব্যতিক্রমী ও গভীর।

গিটার হাতে নতুন লড়াই: ‘উচ্চারণ’-এর জন্ম
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আজম খান অস্ত্র নামিয়ে তুলে নেন গিটার। কিন্তু সংগ্রাম থামাননি। ১৯৭২ সালে বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তোলেন ঐতিহাসিক ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’। এই দলই বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীতের আনুষ্ঠানিক সূচনা করে।

বিটিভিতে যখন তার ‘এত সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই থাকবে না রে’ আর ‘চার কালেমা সাক্ষী দেবে’ গান দুটি প্রচারিত হয়, তখন সারা দেশে রাতারাতি আলোড়ন ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ বুঝে যায়, বাংলা গানে এসেছে এক নতুন যুগ।

সত্যিকারের গল্প, মানুষের ভাষা
আজম খানের গানের শক্তি ছিল এর সারল্য আর সত্যনিষ্ঠতায়। তিনি গাইতেন সাধারণ মানুষের কথা, ফুটপাতবাসীর বঞ্চনার কথা, যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতির যন্ত্রণার কথা। ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’, ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’, ‘আলাল ও দুলাল’, ‘পাপড়ি কেন বোঝে না’, ‘হাইকোর্টের মাজারে’—প্রতিটি গানই যেন স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর।

তার ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’ গানটি স্বাধীনতার পরও মানুষের দুর্দশা তুলে ধরে, যা সে সময়ের তরুণ প্রজন্মকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। সেই গান শুধু সংগীত ছিল না; ছিল একটি সামাজিক দলিল। এ কারণেই তিনি কেবল শিল্পী নন, হয়ে ওঠেন মানুষের ‘গুরু’, বাংলা পপ সংগীতের ‘সম্রাট’।

সংগীতের বাইরে: অভিনেতা আজম খান
আজম খান কেবল গায়ক ছিলেন না; ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। আশির দশকে জনপ্রিয় বিটিভি ধারাবাহিক ‘হিরামন’-এর ‘কালা বাউল’ পর্বে বাউলশিল্পীর চরিত্রে তার সাবলীল অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করে। ২০০৩ সালে শাহীন-সুমন পরিচালিত ‘গডফাদার’ চলচ্চিত্রে শক্তিশালী খল চরিত্রে অভিনয় করে প্রমাণ করেন, গানের মতো অভিনয়েও তিনি অসাধারণ। আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে বাংলালিংকের ‘দিন বদল’ বিজ্ঞাপনেও তাকে দেখা গেছে, যা আজও মানুষের স্মৃতিতে অমলিন।

মঞ্চে আজম খান ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মানুষ। এলোমেলো চুল, দৃঢ় পদক্ষেপ আর শরীরের প্রতিটি অঙ্গে কাঁচা, খাঁটি প্রাণশক্তি দিয়ে তিনি দর্শকদের সম্মোহিত করে রাখতেন। তিনিই ছিলেন সংগীতমঞ্চে বাংলাদেশের প্রথম ‘রক স্টার’। তবু খ্যাতি কখনো তাঁর অহংকার ছুঁতে পারেনি। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থেকেও তিনি ঢাকার কমলাপুরে কাটিয়েছেন অতি সাধারণ জীবন।

উত্তরাধিকার: যে সুর কখনো থামেনি
আজম খান শুধু গান গাননি; গড়ে দিয়েছেন একটি সংগীত-আন্দোলনের ভিত্তি। তার পথ ধরেই বিকশিত হয়েছে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ব্যান্ড সংগীতের ঐতিহ্য। সোলস, ফিলিংস, এলআরবি, ব্ল্যাক, আর্টসেল—বাংলাদেশের প্রতিটি ব্যান্ডই আজম খানকে তাদের পূর্বসূরি হিসেবে শ্রদ্ধা করে।

তিনি প্রমাণ করেছেন, বাংলায় পাশ্চাত্য ধাঁচের সংগীত সম্ভব—এবং তা হতে পারে আরও শক্তিশালী ও প্রাসঙ্গিক।

অমরত্বের পথে বিদায়
দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে এই কিংবদন্তি শিল্পী ২০১১ সালের ৫ জুন ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যু একটি যুগের অবসান ঘটালেও, তার গান আর সাহস বাঙালির হৃদয়ে অমরত্ব পেয়েছে। ২০১৯ সালে মরণোত্তর একুশে পদক এবং ২০২৫ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার—দেশের দুই সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মানে ভূষিত হন তিনি।

যে মানুষটি অস্ত্র হাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছেন, তিনিই কাঁধে গিটার নিয়ে ফিরে এসে বাঙালিকে উপহার দিয়েছেন অসংখ্য কালজয়ী গান। যেকোনো অনুষ্ঠানে ‘ওরে সালেকা’ কিংবা ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’ বেজে উঠলে একটি প্রজন্ম ফিরে যায় সত্তরের দশকে—যখন এক তরুণ মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র নামিয়ে গিটার তুলে নিয়ে বাংলাদেশকে দেখিয়েছিলেন এক নতুন স্বপ্ন।

আজম খান কেবল একজন পপতারকা নন; তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এক অনস্বীকার্য সত্য, আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি ছিলেন একজন বীর। ছিলেন গুরু। ছিলেন পপসম্রাট। গুরু আজম খান—স্যালুট!


মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ