শতবর্ষের অনুসন্ধানের শেষে ধরা পড়ল বেটেলজুসের সঙ্গীতারা
রাতের আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও পরিচিত তারাগুলোর একটি বেটেলজুসকে প্রদক্ষিণ করা অস্পষ্ট এক সঙ্গীতারার এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্পষ্ট ছবি প্রকাশ করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। গত মঙ্গলবার প্রকাশিত এই ছবিকে শতাব্দীপ্রাচীন এক অনুসন্ধানের পরিসমাপ্তি হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।
কালপুরুষ মণ্ডলের এই লোহিত অতিদানব তারাটিকে অনেকে চেনেন শিকারির কাঁধ হিসেবে। ইতিহাসজুড়ে মানুষ বিস্ময় নিয়ে তাকিয়েছে এটির দিকে। বিভিন্ন নথি থেকে ধারণা করা হয়, হাজার বছর আগে প্রাচীন মিসরীয়রা এবং অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীরাও লক্ষ করেছিলেন, নির্দিষ্ট চক্রে তারাটির উজ্জ্বলতা বদলায়।
এই ওঠানামার কারণ দীর্ঘদিন রহস্য হয়ে ছিল। ২০২৪ সালে প্রকাশিত দুটি গবেষণায় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ধারণা দেন, অনেক ছোট আকারের একটি সঙ্গীতারা সামনে দিয়ে অতিক্রম করার কারণেই এমনটা ঘটে। ওই গবেষণাগুলোতেই হিসাব করে বলা হয়েছিল, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পৃথিবী থেকে দেখতে সঙ্গীতারাটি বেটেলজুস থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থান করবে—অর্থাৎ তখনই সেটি শনাক্ত করা সবচেয়ে সহজ হবে।
সেই সময়েই চিলির আতাকামা মরুভূমিতে অবস্থিত ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজারভেটরির (ইএসও) ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ দিয়ে পর্যবেক্ষণ চালান গবেষকরা। গত ৩ ও ৬ ডিসেম্বর নেওয়া পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত হয় স্ফিয়ার (স্পেক্ট্রো-পোলারিমেট্রিক হাই-কনট্রাস্ট এক্সোপ্ল্যানেট রিসার্চ) নামের যন্ত্রটি, যা মূলত সৌরজগতের বাইরের গ্রহ খোঁজার জন্য তৈরি। তথ্য প্রক্রিয়াজাত ও বিশ্লেষণ করতে লেগে যায় আরও কয়েক মাস। ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ‘অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকস’ সাময়িকীতে।
গবেষণার প্রধান লেখক প্যারিস মানমন্দিরের মিগেল মোঁতার্জেস এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এটি শতাব্দীব্যাপী এক অনুসন্ধানের পরিসমাপ্তি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দেখিয়েছি, বেটেলজুস একা নয়; এর সঙ্গে রয়েছে একটি অস্পষ্ট সঙ্গীতারা।’ প্রক্রিয়াজাত ছবিগুলো দেখে নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ছবিগুলো দেখে আমি চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠেছিলাম।’
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করেছিলেন, বেটেলজুসের প্রবল আলোর কারণে টেলিস্কোপে সঙ্গীতারাটি ধরা পড়বে না। কারণ, বেটেলজুস সূর্যের চেয়ে বহুগুণ বড়—এর ব্যাসার্ধ সূর্যের প্রায় ১ হাজার ৪০০ গুণ, আর এটি সূর্যের চেয়ে এক লাখ গুণ বেশি আলো বিকিরণ করে।
শেষে দেখা গেল, সঙ্গীতারাটি ধারণার চেয়ে অনেক বেশি ভারী—সূর্যের দুই থেকে তিন গুণ ভরের। এ কারণেই সেটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়। মোঁতার্জেস বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমার মনে হয়েছিল পূর্বানুমান অনুযায়ী বেটেলজুস বি শনাক্ত করার সংবেদনশীলতা আমাদের নেই। ধারণার চেয়ে বেশি ভারী হওয়ার কারণেই আমরা এটি দেখতে পেয়েছি।’ ছবিতে সঙ্গীতারাটিকে বেটেলজুস থেকে প্রায় ৮ দশমিক ৮ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট দূরত্বে দেখা গেছে।
সহ-গবেষক ও প্যারিস মানমন্দিরের জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যান্থনি বোকালেত্তি বলেন, গ্রহ খোঁজার জন্য তৈরি স্ফিয়ার ও উন্নত প্রক্রিয়াজাতকরণ কৌশল যে বেটেলজুসের মতো বিবর্তিত বিশাল তারার সঙ্গীও শনাক্ত করতে পারে, তা লক্ষণীয়।
সঙ্গীতারাটির অস্তিত্ব চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করতে আরও পর্যবেক্ষণ দরকার। এক বছর পর তারাটির উল্টো পাশে গিয়ে সেটিকে আবার দেখতে হবে। তবে মোঁতার্জেসের ভাষ্য, ‘সন্দেহের জায়গা আর খুব সামান্যই অবশিষ্ট আছে।’
এই আবিষ্কার নতুন এক প্রশ্নও সামনে এনেছে। বেটেলজুস একদিন সুপারনোভা বিস্ফোরণে ধ্বংস হবে বলে ধারণা করা হয়। সঙ্গীতারাটির উপস্থিতি সেই বিস্ফোরণের সময়ের হিসাব জটিল করে দিতে পারে। মোঁতার্জেস বলেন, দুটি তারার মধ্যে মিথস্ক্রিয়া ঘটে থাকলে বা ভবিষ্যতে ঘটলে তা সুপারনোভাকে বিলম্বিত বা ত্বরিত করতে পারে। তাঁর মতে, এই সঙ্গী লোহিত অতিদানবটির বিবর্তনে প্রভাব ফেলবে কি না, সেই প্রশ্ন সত্যিকার অর্থেই খুলে গেল।
এর আগে ২০১৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে টানা পাঁচ মাস নাটকীয়ভাবে নিষ্প্রভ হয়ে গিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছিল বেটেলজুস। বিজ্ঞানীরা প্রথমে ভেবেছিলেন, এই পরিবর্তনের অর্থ তারাটি শিগগিরই বিরাট সুপারনোভা বিস্ফোরণে মৃত্যুবরণ করবে। তবে পরবর্তী পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, তারাটির পৃষ্ঠ থেকে বিপুল পরিমাণ বস্তু নিক্ষিপ্ত হয়ে যে ধূলিমেঘ তৈরি হয়েছিল, সেটিই আলো আটকে দিয়েছিল।
মতামত দিন