চাকরি পাওয়ার খুশিতে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার আসিফ
খুলনায় নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আয়মান মো. আজমুল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী শেখ আসিফ হোসেন। নতুন চাকরি পাওয়ার পর বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে তিনি ওই ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন বলে তদন্তসংশ্লিষ্টদের জানিয়েছেন।
বুধবার রাতে গ্রেপ্তার হওয়া আসিফ হোসেন বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে খুলনা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এ নিয়ে আজমুলের মৃত্যুর ঘটনায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীসহ মোট চারজনকে গ্রেপ্তার করা হলো।
হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-৬-এর অধিনায়ক নিস্তার আহমেদ জানান, গত মঙ্গলবার রাত আড়াইটার দিকে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার ভাটিয়াপাড়া গোলচত্বর থেকে আসিফকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে বুধবার তাকে হরিণটানা থানায় হস্তান্তর করা হয়। আসিফ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ১৮ ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী। তার বাড়ি খুলনার পাইকগাছা উপজেলার সনাতনকাটি গ্রামে।
জিজ্ঞাসাবাদে আসিফ জানিয়েছেন, একটি ব্যাংকে তার চাকরি হয়েছিল এবং ২০ সেপ্টেম্বর তার কাজে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। যোগদানের আগে বিদায় নিতে গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলসংলগ্ন একটি ভবনে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে যান তিনি। সেখানে গিয়ে আজমুলকে কয়েকজন সহপাঠী ও বন্ধুর মারধরের মধ্যে দেখতে পান বলে দাবি করেছেন আসিফ।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে আজমুলকে ভবনের চারতলার ছাদে নিয়ে আবারও মারধর করা হয়। তার কাছ থেকে ভাত চুরি করে খাওয়া, মোবাইল ফোন ও টাকা চুরির স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হয়। এ সময় উপস্থিত কয়েকজন তার বক্তব্যের ভিডিও ধারণ করেন। পরে আজমুলকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হলে তিনি আতঙ্কে চারতলার ছাদ থেকে পাশের তিনতলায় লাফ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখানে পা পিছলে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তার মৃত্যু হয়।
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-৬-এর অধিনায়ক নিস্তার আহমেদ বলেন, তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজসহ বিভিন্ন আলামত যাচাই করে আসিফের দেওয়া তথ্যের সত্যতা খতিয়ে দেখছেন।
জিজ্ঞাসাবাদে আসিফ আরও দাবি করেছেন, মেস ম্যানেজার মেহেদী এবং কৃষি ব্যাংকের খুলনার টাউন নওয়াপাড়া শাখার ক্যাশ অফিসার হাসনাত হাবিব রিফাত ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত এবং তারা ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী। একই সঙ্গে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা হলের সামনে থাকা মা-বাবার দোয়া তানহা জুস কর্নারের মালিক তারেক হাসান রুবেল আজমুলকে বেশি মারধর করেছিলেন বলেও তিনি দাবি করেছেন। এসব দাবি তদন্তে যাচাই করা হচ্ছে।
এর আগে মঙ্গলবার রাতে হাসনাত হাবিব রিফাত ও তারেক হাসান রুবেলকে গ্রেপ্তার করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন। একই ঘটনায় প্রতাপ সরকার নামে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। পরে আসিফকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে মামলায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা চারজনে দাঁড়ায়।
পুলিশ জানিয়েছে, আজমুলকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় প্রতাপ সরকার ও তারেক হাসান রুবেল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। বুধবার দুপুরে খুলনা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইব্রাহিম খলিল তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এর আগে মঙ্গলবার রাতে আদালতে জবানবন্দি দেন হাবিব রিফাত।
হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন বলেন, মামলায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রতাপ সরকারকে গোয়েন্দা পুলিশ এবং বাকি তিনজনকে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন গ্রেপ্তার করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। গ্রেপ্তার চারজনের মধ্যে হাবিব রিফাত, প্রতাপ সরকার, তারেক হাসান রুবেল ও শেখ আসিফ হোসেন আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলার অন্যতম আসামি মেহেদীকে গ্রেপ্তার করা গেলে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে জানান তিনি।
গত শুক্রবার রাতে ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগ তুলে প্রথমে আজমুলকে মারধর করা হয় বলে মামলার তথ্য থেকে জানা গেছে। পরে মেসে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের কাপড়, টাকা ও অন্যান্য জিনিস চুরির অভিযোগও তার বিরুদ্ধে তোলা হয়। চারতলা মেস ভবনের ছাদে মারধরের একপর্যায়ে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন আজমুল। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আজমুলের বাড়ি চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানার এলাকায়। এ ঘটনায় তার বাবা মো. কুতুব উদ্দীন বাদী হয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান চার শিক্ষার্থীর নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করে মামলা করেন।
মতামত দিন